২০ কিলোমিটার দূরে ভোটকেন্দ্র, যেতে হবে হেঁটে
বান্দরবানের নীলগিরি পর্যটনকেন্দ্র–সংলগ্ন কাপ্রু পাড়া। এই পাড়ার বাসিন্দা মেনদুই ম্রো জানান, তাঁদের ভোটকেন্দ্রের নাম পালংমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ কেন্দ্রে পৌঁছাতে হেঁটে যেতে হবে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। আবার সড়কপথে যানবাহনে জেলা শহর ও সরই হয়ে গেলে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে কেন্দ্রটি। ভোট দিতে গেলে ভোটকেন্দ্রের কাছে রাতযাপনের প্রয়োজন পড়বে ভোটারদের।
একই অবস্থা বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের দোলাপাড়া, তাংখুংপাড়া, মংহ্লাপাড়ার ভোটারদেরও। তাংখুংপাড়ার বাসিন্দা লাং রাও ম্রো জানান, তাঁদের আট কিলোমিটার হেঁটে জিন্দাবটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ভোট দিতে যেতে হয়।
কেবল মেনদুই ম্রো ও রাও ম্রো নয়, বান্দরবানের অন্তত তিনটি উপজেলার দুর্গম অনেক এলাকার বাসিন্দাদেরই ভোটকেন্দ্রে যেতে হয় দীর্ঘ পথ হেঁটে। অনেক ক্ষেত্রে কিছুদূর গিয়ে সড়কপথ থাকলেও ভোটের দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় এই ভোটারদের। ফলে এসব এলাকার ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসাও চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে সম্প্রতি উঠে এসেছে নির্বাচন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায়।
বান্দরবানে অনেকটা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ১১টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানো হয় হেলিকপ্টারে করে। ওই কেন্দ্রগুলোকে ‘হেলিসটি’ কেন্দ্র বলা হয়। তবে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারিত হওয়ায় আগের চেয়ে ‘হেলিসটি’ কেন্দ্র কমে এসেছে। আগে বান্দরবানে ১৫ থেকে ১৮টি ‘হেলিসটি’ কেন্দ্র ছিল।
বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের বাবুপাড়ার বাসিন্দাদের একজন ৭৭ বছর বয়সী মেননী ম্রো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে হলে তাঁকে পাহাড় ও ঝিরি-ঝরনা পেরিয়ে হেঁটে যেতে হবে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের মুরংবাজারে। ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় তিন ঘণ্টা। অবশ্য পাড়া থেকে কিছুদূরে গিয়ে গাড়ি চলাচলের রাস্তা রয়েছে। তবে ভোটের দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় হাঁটা ছাড়া উপায় নেই তাঁর। এ অবস্থায় এত দূর পথ পাড়ি দিয়ে ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন বলে জানালেন মেননী ম্রো।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৮৬টি। এর মধ্যে অতিদুর্গম কেন্দ্র ৩৮টি, যেখানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও নেই। এসব কেন্দ্রের অধিকাংশে সড়ক যোগাযোগ নেই, কোনোটিতে সীমিত আকারে রয়েছে। ভোটারদের পায়ে হেঁটে কেন্দ্রে আসতে হয়।
বান্দরবানের ৩০টি ভোটকেন্দ্রে কিছুদূর পায়ে হেঁটে এবং এরপর সড়কপথে যানবাহনে যাতায়াত করা সম্ভব। কিন্তু ভোটের দিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় হেঁটেই যেতে হয় ভোটারদের। আসনের অন্তত ৫০টি ভোটকেন্দ্রে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, বান্দরবানে অনেকটা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ১১টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানো হয় হেলিকপ্টারে করে। ওই কেন্দ্রগুলোকে ‘হেলিসটি’ কেন্দ্র বলা হয়। তবে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারিত হওয়ায় আগের চেয়ে ‘হেলিসটি’ কেন্দ্র কমে এসেছে। আগে বান্দরবানে ১৫ থেকে ১৮টি ‘হেলিসটি’ কেন্দ্র ছিল।
দুর্গম এলাকার স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের চিহ্নিত করে তাঁদের যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। প্রয়োজনে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও কমিশন থেকে করা যেতে পেরে। নির্বাচন কমিশন এই ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনেক সময় প্রার্থীরা ‘অনৈতিকভাবে’ এসব সুবিধা ভোটারদের জন্য নিশ্চিত করেন, যা নিয়ে সমালোচনা হয়।
বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আবদুল শুক্কুর বলেন, জেলায় দুর্গম কেন্দ্রের সংখ্যা বেশি থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায়। থানচি উপজেলা সদর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে সর্বশেষ ভোটকেন্দ্র বড় মদক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
থানচির জনপ্রতিনিধিরা জানান, রেমাক্রী ইউনিয়নের বড় মদক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মিয়ানমারের সীমান্তসংলগ্ন পানঝিরি, লৈইক্রী ও আন্ধারমানিক থেকে বাসিন্দারা ভোট দিতে আসেন। এ ক্ষেত্রে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করলে জনপ্রতি এক হাজার টাকা খরচ হয়। এক রাত থাকা-খাওয়ার খরচসহ প্রায় দুই হাজার টাকা প্রয়োজন। তিন্দু ইউনিয়নের প্রতিটি কেন্দ্রেরও একই রকম অবস্থা।
নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বান্দরবানে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করে নির্বাচন আয়োজনের জন্য ১০টি চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রে ভোটার নিয়ে আসা, আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র কার্যক্রম, মুঠোফোন নেটওয়ার্কহীন ও বিদ্যুৎবিহীন কেন্দ্রের ফলাফল দ্রুত পৌঁছানোর বিষয়টি রয়েছে।
জানতে চাইলে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল আলম বলেন, চ্যালেঞ্জগুলো প্রকৃত নয়, অনুমিত। এ পর্যন্ত এসব বিষয়ে কোনো প্রার্থী অভিযোগ করেননি। তবে এটা ঠিক, দুর্গম কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতির কিছুটা চ্যালেঞ্জ আছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি বলেন, দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের যাতায়াতের সমস্যার ব্যাপারে আলাপ চলছে। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে জানানো হবে। নির্বাচন কমিশন থেকে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা এত স্বল্প সময়ে সম্ভব নয়, তবে এলাকার বাস্তবতায় সীমিত পরিসরে যানবাহন চালু রাখা যায় কি না, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।