মৌলভীবাজার এতিম ও প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, নয়নতারা ও লিমা আক্তার দুজনই সিলেটের বেবি হোমে বেড়ে উঠেছেন। বেবি হোমে সাত বছর বয়স হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী, তাঁদের সিলেটে সরকারি শিশু পরিবারে পাঠানো হয়। শিশু পরিবারে থেকে তাঁরা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর তাঁদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় মৌলভীবাজার এতিম ও প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। নয়নতারা এ কেন্দ্রে আসেন ছয় বছর আগে। তিনি এখানে থেকে সেলাই ও বাটিকের কাজ শিখেছেন। অন্য দিকে লিমা আক্তার এ কেন্দ্রে এসেছেন ছয় মাস আগে। তিনি সেলাই ছাড়াও পোলট্রি মুরগি লালন-পালন, গাড়ি চালানো ও বিউটি পারলারের কাজ শিখেছেন।

এতিম ও প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে গভীর নলকূপের কাজ করতে এসে লিমাকে পছন্দ হয় আল-আমিনের। এরপর আল-আমিনের পরিবারের লোকজন এসে লিমার অভিভাবক কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। আল-আমিনের বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগরের পশ্চিম পয়লনপুরে। অন্যদিকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মচারী জরিনা বেগম তাঁর ভাগনে মো. সাব্বিরের জন্য নয়নতারাকে পছন্দ করেন। পরে পরিবারের লোকজন এসে কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। মো. সাব্বির সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান এবং তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কনকপুরে।

আমি দুই ছেলের বাসায় গিয়েছি। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছি। পরিবারের সম্মতির ভিত্তিতেই বিয়ে ঠিক হয়েছে।
এ কে এম মিজানুর রহমান, সহকারী মহাব্যবস্থাপক, মৌলভীবাজার প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র

প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সহকারী মহাব্যবস্থাপক এ কে এম মিজানুর রহমান বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দুই ছেলের বাসায় গিয়েছি। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছি। পরিবারের সম্মতির ভিত্তিতেই বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা করতে যা কিছু প্রয়োজন, আমরা সব করেছি।’ তিনি আরও বলেন, বিয়ে সম্পন্ন করতে দুই কন্যার উকিল বাবা হয়েছেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান। জেলা প্রশাসক, কেন্দ্রের কর্মকর্তাসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মকর্তা, স্থানীয় অনেক ব্যক্তি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। দুই কন্যাকে খাট, লেপতোশক, হাঁড়ি-পাতিলসহ সংসার সাজানোর বিভিন্ন সামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার কেন্দ্রেই ছিল বিয়ের আয়োজন। গত বুধবার রাতে হয়েছে গায়েহলুদ। এতে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদ, জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরীনা রহমান, কবি সৈয়দ মোসাহিদ আহমদ প্রমুখ। বৃহস্পতিবার বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা জোহরা আলাউদ্দিন, জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানিয়া সুলতানা, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মল্লিকা দে, সমাজসেবা অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম, সমাজসেবা অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান, সিলেটের উপপরিচালক মো. আবদুর রকিব প্রমুখ। দুই কন্যার বিয়েতে দুই লাখ টাকা করে কাবিন ধার্য করা হয়েছে।

বিয়েতে দেখা গেছে, সামাজিক রীতি অনুযায়ী দুই বরকে বরণ করা হয়েছে। এতিম ও প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সব প্রশিক্ষণার্থী, বরযাত্রী, অতিথিসহ প্রায় ৩০০ মানুষকে আপ্যায়ন করা হয়েছে। নয়নতারা ও লিমা পরেছিলেন টুকটুকে লাল লেহেঙ্গা। দুই বরও সেজেছিলেন বিয়ের সাজে।

লিমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সিলেটে ছিলাম। আমার মা-বাবা নাই। স্যার তাঁরাই আমার মা-বাবা। এখানে অনেক সুখী মনে করি। আজকে অনেক ভালো লাগছে।’ লিমার বর আল-আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁর (লিমার) বাপ-মা নাই এটা জেনে, দেখেশুনেই বিয়ে করছি। আমার বাবা-মা সবারই সম্মতি আছে।’

নয়নতারা প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্যাররা আমাকে সন্তানের মতো আদর করেছেন। নতুন সংসারে যাব, ভালোই লাগছে।’ তাঁর (নয়নতারার) বর মো. সাব্বির বলেন, ‘আমি সবকিছু জেনেশুনেই বিয়ে করেছি। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমরা যেন ভালোভাবে চলতে পারি।’

কেন্দ্রের প্রশিক্ষণার্থী ফাতেহা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, দুই কন্যা খুব ভালো। সবার সঙ্গে তাঁদের সুন্দর সম্পর্ক ছিল। সবাই মিলেমিশে চলেছেন। সন্ধ্যার দিকে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাঁদের বিদায় দেওয়া হয়েছে।

দুই কন্যার উকিল বাবা ও জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান প্রথম আলোকে বলেন, আজ একটা আনন্দের দিন। নয়নতারা ও সাকিলার বিয়ে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আড়ম্বরপূর্ণ গায়েহলুদ ও পারিবারিক সব নিয়মকানুন অনুযায়ী তাঁদের বিয়ে হচ্ছে। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা যে রকম ছেলের কাছে কন্যাকে তুলে দেন, সেভাবেই তুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুই কন্যার প্রত্যেককে এক লাখ টাকা দিয়েছেন।