হলফনামা বিশ্লেষণ: সিলেটের অর্ধেক প্রার্থীই নির্বাচন করবেন ‘বিদেশি টাকায়’
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী। নির্বাচনে তিনি সম্ভাব্য ব্যয় করবেন ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় থেকে ব্যয় করবেন ১৫ লাখ টাকা। ফ্রান্সপ্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ী দেবেন ৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৫ লাখ টাকা দেবেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই চাচাতো ভাই এবং দেশে থাকা এক খালাতো বোন।
সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে এমরান আহমদের মতো ১৭ জন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের টাকা আসবে প্রবাস থেকে। এই অর্থ দেবেন তাঁদের প্রবাসী স্বজন-শুভানুধ্যায়ীরা। ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৩ জন প্রার্থী। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রার্থীদের হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের সম্ভাব্য হিসাব বিবরণী থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
হিসাব বিবরণী ঘেঁটে দেখা গেছে, সিলেটের প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র নয়জন নিজ আয়ের টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন। একজন প্রার্থী সম্পূর্ণ দানের টাকায় নির্বাচনী খরচ মেটাবেন। অন্যরা স্ত্রী, সন্তান, ভাই–বোন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দান হিসেবে পেয়ে কিংবা ধারকর্জ করে নির্বাচনী খরচ করবেন। এ ছাড়া টিউশনের আয় আর দলীয় কর্মী-সমর্থকদের টাকায়ও নির্বাচনী খরচ চালাবেন কেউ কেউ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে এখানে সব সময় যেমন প্রবাসী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তেমনি প্রবাসী স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের টাকায়ও প্রার্থীদের অনেকে নির্বাচনী ব্যয় মেটান। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়।
সিলেট-১ আসন
সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে মোট প্রার্থী আটজন। এর মধ্যে তিনজন নিজ আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের টাকায় নির্বাচনী ব্যয় মেটাবেন। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. শামীম মিয়া ব্যবসা ও ব্যাংক সুদের আয় থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ টাকা খরচ করবেন। এ ছাড়া প্রবাস থেকে দান হিসেবে পাওয়া ১১ লাখ এবং আত্মীয়স্বজন নন, এমন ১২ জনের কাছ থেকে পাওয়া ১০ লাখ টাকা খরচ করবেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান নিজ আয়ের ১ লাখ ২০ হাজার, প্রবাসী চাচার কাছ থেকে পাওয়া ২ লাখ ৯০ হাজার এবং দলের নেতা-কর্মীদের দানের ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ করবেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নিজ আয়ের এক লাখ, প্রবাসী স্বজনদের থেকে পাওয়া তিন লাখ এবং দলের সদস্য ও সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া এক লাখ টাকা খরচ করবেন।
নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ৫৫ লাখ টাকা খরচ করবেন বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। এর মধ্যে তাঁর নিজ আয়ের ২৫ লাখ টাকা। বাকি টাকার মধ্যে স্ত্রীর কাছ থেকে ১৫ লাখ, ভগ্নিপতির কাছ থেকে ১০ লাখ ও ভাগনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দান হিসেবে পাবেন।
জামায়াতে ইসলামীর হাবিবুর রহমান নিজ আয়ের ৩০ লাখ টাকা খরচ করবেন। সবচেয়ে কম খরচ করবেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রণব জ্যোতি পাল। তিনি নিজ তহবিলের ৫০ হাজার, শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে দান হিসেবে পাওয়া ৫০ হাজার এবং দলের মাধ্যমে গণচাঁদা হিসেবে পাওয়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন।
অন্য প্রার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) সঞ্জয় কান্ত দাস টিউশনি আয়ের চার লাখ, দান হিসেবে পাওয়া দুই লাখ টাকা খরচ করবেন। গণ অধিকার পরিষদের আকমল হোসেন ব্যবসা থেকে আয় করা সাত লাখ এবং দানের পাঁচ লাখ টাকা খরচ করবেন।
সিলেট-২ আসন
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থীর সবাই প্রবাস থেকে কমবেশি টাকা পাবেন। বিএনপির তাহসিনা রুশদীর ২০ লাখ টাকা খরচ করবেন। এর মধ্যে নিজ আয়ের পাঁচ লাখ ও ভগ্নিপতির কাছ থেকে ধার করা পাঁচ লাখ টাকা আছে। বাকি ১০ লাখ পেয়েছেন দুজন প্রবাসীর কাছ থেকে।
১০–দলীয় জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী ২৫ লাখ টাকা খরচ করবেন। এর মধ্যে নিজের আয়ের রয়েছে ১০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। বাকি টাকা প্রবাসীদের থেকে দান ও কর্জ হিসেবে পেয়েছেন।
জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ১১ লাখ টাকা খরচ করবেন। এর মধ্যে এক লাখ টাকা তাঁর নিজের। বাকি ১০ লাখ টাকা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ছেলের কাছ থেকে পেয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আমির উদ্দিন নিজ আয়ের ৬৩ হাজার, প্রবাসী দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ধার আনা ৮০ হাজার এবং দলের নেতা-কর্মীদের দানের ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন।
গণফোরামের মো. মুজিবুল হক নিজ আয়, স্বেচ্ছাপ্রদত্ত অনুদান ও দলীয় তহবিল থেকে পাঁচ লাখ টাকা নির্বাচনে খরচ করবেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যপ্রবাসী স্বজনদের থেকে পাওয়া ১২ লাখ টাকাও খরচ করবেন। এর বাইরে তিনি ধার ও দান হিসেবে পাওয়া আরও তিন লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
সিলেট-৩ আসন
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে মোট প্রার্থী ছয়জন। এর মধ্যে তিনজন প্রার্থী নিজেদের আয়ে নির্বাচন করবেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দীন রাজু ৫৯ লাখ ১ হাজার ৫৩৩ টাকা, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী ৪০ লাখ টাকা এবং জাতীয় পার্টি মোহাম্মদ আতিকুর রহমান ২০ লাখ টাকা খরচ করবেন।
অপর তিন প্রার্থী নিজ আয়ের পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছ থেকে কমবেশি টাকা পাবেন। বিএনপির এম এ মালিক নিজ আয়ের ২০ লাখ টাকা খরচ করবেন। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ছেলের কাছ থেকে পাওয়া টাকাও খরচ করবেন। তবে সেটা কী পরিমাণ, তা হলফনামায় স্পষ্ট বোঝা যায়নি।
ইসলামী আন্দোলনের রেদওয়ানুল হক চৌধুরী নিজ আয়ের ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা, প্রবাসী দুই ভাইয়ের কাছ থেকে দান হিসেবে পাওয়া ৩ লাখ এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে অনুদান পাওয়া ২ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মইনুল বাকের নিজ আয়ের পাঁচ লাখ টাকা খরচ করবেন। এর বাইরে প্রবাসী স্বজনদের কাছে থেকে ধার ও দান হিসেবে পাওয়া ১০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এ ছাড়া তিনি প্রবাসী শুভানুধ্যায়ীদের থেকে দান হিসেবে ১২ লাখ এবং জায়গা বিক্রি করে ২০ লাখ পেয়েছেন। এসব টাকায়ও তিনি নির্বাচনী ব্যয় মেটাবেন।
সিলেট-৪ আসন
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে মোট প্রার্থী পাঁচজন। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাঈদ আহমদ নিজ আয়ের পাশাপাশি প্রবাসীর দানের টাকায় নির্বাচনী ব্যয় মেটাবেন। তিনি ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ করবেন। এর মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে দান হিসেবে পেয়েছেন। বাকি টাকা তাঁর আয় এবং ভাই ও দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া।
অন্য প্রার্থীদের মধ্যে নিজের আয় থেকে বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী ৩৫ লাখ, জাতীয় পার্টি মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান ৫ লাখ এবং গণ অধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম ১০ লাখ টাকা খরচ করবেন। জামায়াতের প্রার্থী মো. জয়নাল আবেদীন নিজ আয়ের ২০ লাখ এবং বাবার কাছ থেকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান হিসেবে পাওয়া ৩ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
সিলেট-৫ আসন
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনে মোট প্রার্থী চারজন। এর মধ্যে দুজন প্রবাসীদের কাছ থেকে নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর টাকা পেয়েছেন। বিএনপির সমর্থন পাওয়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের উবায়দুল্লাহ ফারুক ১২ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এর মধ্যে নিজ আয়ের রয়েছে দুই লাখ টাকা। বাকি টাকা প্রবাসী স্বজনদের থেকে ধার ও দান হিসেবে পাচ্ছেন।
খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান নিজ আয়ের তিন লাখ টাকা খরচ করবেন। তিনি প্রবাসী শ্যালকের কাছ থেকে দান হিসেবে পেয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা। এ ছাড়া নয়জন শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে দান হিসেবে পাওয়া ১৭ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ লাখ টাকা দিচ্ছেন ছয়জন প্রবাসী। অপর দুই প্রার্থীর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ এক ভাইয়ের কাছ থেকে দান হিসেবে পাওয়া ২৫ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন। অন্য প্রার্থী বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. বিলাল উদ্দিন নিজ আয়ের পাঁচ লাখ টাকা খরচ করবেন।
সিলেট-৬ আসন
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে মোট প্রার্থী পাঁচজন। এর মধ্যে তিনজন নিজ আয়ের পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছ থেকে পাওয়া টাকাও ব্যয় করবেন। বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরী সম্ভাব্য ব্যয় করবেন ৬৫ লাখ টাকা। এর অধিকাংশই তিনি পেয়েছেন প্রবাসী স্বজন-শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে।
জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর খরচ করবেন ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দান পেয়েছেন ২২ লাখ টাকা। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফখরুল ইসলাম ২৪ লাখ টাকার মধ্যে ভাইয়ের প্রবাসী আয়ের ২০ লাখ টাকা দান পাচ্ছেন। অপর দুই প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ২৪ লাখ ১৩ হাজার এবং গণ অধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমান ২৫ লাখ টাকা খরচ করবেন।