রঙে জেগে উঠছে সাতক্ষীরা, পয়লা বৈশাখ নিয়ে ব্যস্ত শিল্পীরা

পয়লা বৈশাখের আগে শিল্পীদের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। আজ সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরা শহরের মিনি মার্কেট এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, ঘড়ির কাঁটা তখন বেলা দুইটা ছুঁই ছুঁই। শহরের অনেক জায়গায় ক্লান্তির ছাপ থাকলেও সাতক্ষীরার শিল্পীপাড়ায় ঠিক উল্টো দৃশ্য—এখানে সময় থেমে নেই, বরং দ্রুত ছুটছে। আঠার গন্ধ, বাঁশের চটার শব্দ, কর্কশিট আর মাটির সরার ভিড়ে রঙের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে আছে চারদিকে। সবকিছুর ভেতরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে পয়লা বৈশাখের আগমনী বার্তা।

উৎসব বরণ করতে দিনরাত এক করে কাজ করছেন স্থানীয় চারু ও মৃৎশিল্পীরা। শহরের মোড় থেকে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সবখানেই চলছে বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর কাগজের স্তর বসিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে বিশাল বাঘ, হাতি আর নানা লোকজ মোটিফ, যেন প্রতিটি ছাঁচে, প্রতিটি রঙে ফিরে আসছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ।

শহরের প্রাণকেন্দ্র মিনিমার্কেটে শিল্পী রফিকুল ইসলাম তখন তুলির শেষ টান দিতে ব্যস্ত। ক্লান্তি আছে, তবু চোখে তৃপ্তির ঝিলিক। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরেই ঘুমহীন সময় কাটছে, তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কাজ এগোচ্ছে দ্রুত। তাঁর কণ্ঠে একধরনের গর্ব—এই শিল্পের ভেতর দিয়েই তিনি তুলে ধরতে চান সাতক্ষীরার ঐতিহ্য।

সেখানেই কথা হয় কণ্ঠশিল্পী চৈতালি মুখার্জীর সঙ্গে। তাঁর কাছে পয়লা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, এটি শিকড়ে ফেরার দিন। এদিনই মনে করিয়ে দেয়, বহু শতাব্দীর পথ পেরিয়েও বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধন অটুট আছে। বাঙালি সংস্কৃতি এগিয়ে চলছে। মানুষ শিকড় ভুলে যায় না, ফিরে আসে মাটির টানে।

শোভাযাত্রার প্রস্তুতির টানে শহরে এসেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও। ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর (ডিবি) বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এমাদুল ইসলাম সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে এসে বলেন, পয়লা বৈশাখ এমন এক আয়োজন, যেখানে পুরোনো সব ক্লান্তি ঝেড়ে নতুনকে স্বাগত জানানো হয়। এই উৎসব তাই সবার, সব শ্রেণির মানুষের।

শুধু শোভাযাত্রার বড় বড় প্রতিকৃতিই নয়, সমান ব্যস্ততা মৃৎপল্লিগুলোতেও। সরাচিত্র, মাটির হাঁড়ি, শিশুদের খেলনা—সবকিছুতেই লেগেছে রঙের ছোঁয়া। লাল, নীল, হলুদ, সবুজের মিশেলে ফুটে উঠছে মাছ, ফুল আর পাখির নকশা। কারিগরদের হাতে যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে গ্রামীণ জীবনের গল্প।

বৈশাখ ঘিরে বাড়ছে মাটির গয়নার চাহিদাও। স্থানীয় এক নারী উদ্যোক্তা পারভিন আক্তার জানান, তরুণীদের পছন্দের তালিকায় এখন এই গয়নাই শীর্ষে। বৈশাখী থিমে তৈরি কানের দুল, নেকলেস, চুড়ির অর্ডার সামলাতে গিয়ে তাঁদের প্রায় বিরামহীন সময় দিতে হচ্ছে।

সব আয়োজনের ভেতরেও সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে অপেক্ষা—নতুন সূর্যের। শহরজুড়ে এখন সেই প্রতীক্ষা। শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায়, মানুষের ব্যস্ততায় আর উৎসবের আবহে সাতক্ষীরা যেন ধীরে ধীরে উচ্চারণ করছে ‘এসো হে বৈশাখ’।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজন করা হবে বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া সাত দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার উদ্বোধন করা হবে। থাকবে লাঠি খেলার আয়োজন। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার বলেন, ‘বৈশাখ উপলক্ষে সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। আশা করছি, বৈশাখী অনুষ্ঠান সাতক্ষীরার মানুষ এবার আনন্দঘন পরিবেশে উপভোগ করবে।’