মগরা নদীর পাড়ে কবিতাকুঞ্জ তালাবদ্ধ, বন্দী হয়ে আছে কবির স্বপ্ন

নেত্রকোনা শহরের মালনী এলাকায় কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত কবিতা কুঞ্জটি নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকে অযত্ন অবহেলায় পরে বন্ধ রয়েছে। এতে করে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ছবিটি রোববার দুপুরে তোলাছবি: প্রথম আলো

মগরা নদীর পাড়ে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসে। নদীর জলে বাতাসের ঢেউ খেলে যায়। একসময় এই নদীর পাড়ে ভেসে আসত কবিতার শব্দ, বইয়ের পাতা ওল্টানোর মৃদু আওয়াজ, আবৃত্তির সুর। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখতেন ‘বিশ্ব কবিতার বাসগৃহ’। কবিতাপ্রেমীরা বসতেন ‘কুঞ্জঘাট’ সিঁড়িতে। কেউ পড়তেন পাবলো নেরুদা, কেউ রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ, কেউবা ওয়াল্ট হুইটম্যান।

আজ সেখানে প্রাণহীন নীরবতা। দরজায় ঝুলছে তালা। ধুলা, মাকড়সা জমছে বইয়ের তাকের পাশে। যে পথ ধরে একসময় কবিতাপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা আসতেন, সেই পথ এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। নেই কবিতার আসর কিংবা সাহিত্যচর্চার কোনো আয়োজন। বিশ্ব কবিতার জন্য নির্মিত একটি স্বপ্নঘর ধীরে ধীরে যেন পরিণত হচ্ছে শূন্য ভবনে।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান কবি নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা পুরস্কারের অর্থ ব্যয় করে যে ‘কবিতাকুঞ্জ’ গড়ে তুলেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠান আজ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। নেত্রকোনার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, ২০২২ সালে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত হওয়ার পর কবিতাকুঞ্জ আরও প্রাণবন্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উল্টো সেটি নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। অনন্য এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সারি সারি বই আজও অপেক্ষা করে পাঠকের স্পর্শের জন্য। দেয়ালে টাঙানো বিশ্বখ্যাত কবিদের প্রতিকৃতি যেন নীরবে সাক্ষ্য দেয় এক অপূর্ণ স্বপ্নের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণা, পড়াশোনাসহ আমার অবর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যাতে টিকে থাকে সেই উদ্দেশ্যে আমি দান করেছিলাম। কিন্তু তা বন্ধ করে অযত্নে অবহেলায় ফেলে রাখায় আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষুব্ধ।
কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবিতা কুঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা

স্বাধীনতা পদকের অর্থে গড়া এক ব্যতিক্রমী স্বপ্ন

নেত্রকোনা শহরের মালনী এলাকায় মগরা নদীর তীরে ৮ শতাংশ খাসজমির ওপর ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে কবিতাকুঞ্জ। ওই বছর স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন নির্মলেন্দু গুণ। পুরস্কারের অর্থ দিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর শুভানুধ্যায়ী, অনুরাগী ও কবিতাপ্রেমীদের সহায়তায় ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায় উদ্যোগটি।

‘বিশ্ব কবিতার বাসগৃহ’ স্লোগানে গড়ে ওঠা কবিতাকুঞ্জে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশের কালজয়ী কবিদের রচিত দুই হাজারের বেশি কাব্যগ্রন্থ। বাংলা, ইংরেজি ও বিভিন্ন ভাষার অনূদিত কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি এখানে সংরক্ষিত আছে বিশ্বের নানা দেশের কবিতা-সম্পর্কিত মূল্যবান বই। রয়েছে বিভিন্ন ভাষার প্রায় ৭০ জন খ্যাতিমান কবির প্রতিকৃতি, নির্মলেন্দু গুণের ব্যক্তিগত স্মারক, সম্মাননা ক্রেস্ট ও নানা সংগ্রহ। একসময় প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন দর্শনার্থী এখানে আসতেন। বিশেষ দিবসে সেই সংখ্যা পাঁচ শও ছাড়িয়ে যেত।

অযত্ন অবহেলায় পরে আছে কবিতা কুঞ্জ
ছবি: প্রথম আলো

কবির স্বপ্ন ছিল গবেষণাকেন্দ্র

কবিতাকুঞ্জ শুধু একটি গ্রন্থাগার নয়। এটি বিশ্বকাব্যচর্চার একটি সম্ভাব্য গবেষণাকেন্দ্র হবে বলে স্বপ্ন ছিল কবির। এর পাশে রয়েছে ‘কুঞ্জঘাট’ এবং গবেষক ও অতিথিদের থাকার জন্য নির্মিত ‘মগরা’ ও ‘সোমেশ্বরী’ নামে দুটি অতিথিশালা।

নির্মলেন্দু গুণ একাধিকবার বলেছেন, তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক, কবি ও শিক্ষার্থীরা এখানে এসে বিশ্বকাব্য নিয়ে কাজ করবেন। কবিতাকুঞ্জের কুঞ্জঘাটে বসে মানুষ জোছনা দেখবে আর কবিতা পড়বে। বিশ্বকবিতার এক অনন্য মিলনস্থল হয়ে উঠবে মগরার এই জনপদ।

নিজের অবর্তমানে কবিতাকুঞ্জ যেন অভিভাবকহীন হয়ে না পড়ে, সেই চিন্তা থেকেই ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মীকরণের প্রস্তাব দেন নির্মলেন্দু গুণ। এক খোলা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে কবিতাকুঞ্জে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার কাব্যসম্পদ নিয়ে তুলনামূলক গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। বাংলা সাহিত্য ও ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি বিশ্বকাব্য ও তুলনামূলক সাহিত্যচর্চারও সুযোগ সৃষ্টি হবে।

একই বছরের ৩০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। তখনকার উপাচার্য রফিক উল্লাহ খান বলেছিলেন, কবির স্বপ্ন বাস্তবায়নে কবিতাকুঞ্জকে সত্যিকার অর্থেই একটি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে এই প্রতিষ্ঠান।

বর্তমান অবস্থা

গতকাল শনিবার বিকেলে ও রোববার দুপুরে দেখা যায়, কবিতাকুঞ্জের প্রবেশপথের ফলকে ‘আমন্ত্রণ’ নামে নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতা—‘কাব্যশক্তি মহাশক্তি, বিধাতার দান/ নরলোকে তিনি ধন্য যিনি তাহা পান/ কাব্যরূপ কুঞ্জে বাস করে যেইজন/ প্রেমভাবে কাটে নিত্য তাহার জীবন’।

মূল ফটকের দুই পাশে থাকা শেফালী ফুলের গাছ দুটি হেলে পড়েছে, তবে দক্ষিণ পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে আছে শত বছরের পুরোনো দেবদারুগাছ। কিন্তু প্রতিটি গাছই পরিচর্যাহীন, লতাগুল্মে আচ্ছাদিত। গাছগুলোর ছায়ায় একসময় কবিতাপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের আড্ডা জমত। কেউ বই পড়তেন, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতেন। এখন সেখানে নেমে এসেছে নির্জনতা। কবিতাকুঞ্জের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ভেতরে বইয়ের তাকগুলো নীরব।

কবিতাকুঞ্জের উত্তর পাশের বাসিন্দা আবদুল বারেক বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এখানে পাঠক ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি নেই। কুঞ্জঘাটও প্রায় জনশূন্য থাকে। নিয়মিত কোনো সাহিত্যসভা, আবৃত্তি অনুষ্ঠান বা পাঠচক্রের না হওয়ায় এটি এখন ভুতুড়ে অবস্থা।
ঘাটে বসে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা রাব্বি মিয়াসহ চার যুবক মুঠোফোন দেখছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকায় তাঁরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

কবিতা কুঞ্জে এখন কারো পদচারণা নেই
ছবি: প্রথম আলো

যা বলছেন সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মীরা

স্থানীয় সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও কবিতাপ্রেমীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার পর কবিতাকুঞ্জের নিয়মিত কার্যক্রম ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে কর্মরত দুজন কর্মীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কাজে নিয়োজিত করা হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় কোনো পাঠক বা দর্শনার্থী এলে দরজা খোলার মতো লোকও খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।

লোকসংস্কৃতি গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়োব জানান, দেশে তো নয়ই, বিশ্বের খুব কম দেশেই কবিতা নিয়ে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে একসময় বইপাঠ, সাহিত্য আলোচনা, আবৃত্তি ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো সংকুচিত হয়েছে। ফলে কবির স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিবর্তে কবিতাকুঞ্জ আজ অনেকটাই অবহেলার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
জেলা উদীচীর সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা না গেলে তা শুধু নেত্রকোনার নয়, দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্যও ক্ষতির কারণ হবে।

কবিতাকুঞ্জ একসময় নেত্রকোনার একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছিল উল্লেখ করে ছড়াকার সঞ্জয় সরকার জানান, এর আকর্ষণে অনেক সাহিত্যামোদী দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতায় প্রতিষ্ঠানটি এখন অচলায়তনে পরিণত হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রতিষ্ঠানটিকে সচল করবে বলে তিনি আশাবাদী।

কবিতা গুঞ্জের বর্তমান দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ
ছবি: প্রথম আলো

কবিতাকুঞ্জের প্রতিষ্ঠাকালীন সাবেক পরিচালক কবি এনামূল হক (পলাশ) বললেন, প্রতিষ্ঠানটিতে তাঁদের শ্রম ঘাম ও আবেগ জড়িত। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন কবি তাঁর রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননার অর্থ ব্যয় করেছিলেন, যে প্রতিষ্ঠানকে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই কবিতাকুঞ্জ কি কবির স্বপ্নের পথে এগোচ্ছে? নাকি মগরা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি ধীরে ধীরে কেবল একটি অপূর্ণ স্বপ্নের স্মারক হয়ে উঠছে?

এ ব্যাপারে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণা, পড়াশোনাসহ আমার অবর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যাতে টিকে থাকে সেই উদ্দেশ্যে আমি দান করেছিলাম। কিন্তু তা বন্ধ করে অযত্নে অবহেলায় ফেলে রাখায় আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষুব্ধ।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য খন্দকার মোহাম্মদ আশরাফুল মুনিমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার আনিছা পারভীন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ নয়। বাংলা বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা চাইলে এটি ব্যবহার করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আরও খোঁজখবর নেব। কবিতাকুঞ্জে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে আরও সক্রিয় করা যায়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’