পথের এক প্রান্তে কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। শরীরটুকু স্থির, চোখ বন্ধ। তাঁর পাশ ঘেঁষে ছুটে চলেছে গাড়ি। হর্ন, আলো ও গতি মিলেমিশে এক নিরন্তর ব্যস্ততা। সময় যেন সেখানে থামে না; বরং গড়িয়ে যায় আরও দ্রুত। কিন্তু সেই স্রোতের মাঝখানে এক টুকরা নীরবতা হয়ে পড়ে থাকেন তিনি। এই দৃশ্য কোনো খবরের ছবি নয়, কোনো ঘটনার দলিলও নয়; এটি সময় ও মানুষের মধ্যকার এক নীরব সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি।
এমনই সব শব্দহীন গল্প নিয়ে চট্টগ্রামের জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারি মিলনায়তনে আলোকচিত্রী সৌরভ দাশের প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘দৃষ্টিতে সৃষ্টি’। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে স্থান পেয়েছে নির্বাচিত ৩৬টি আলোকচিত্র।
আজ শুক্রবার বিকেলে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকী ও বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখার আগে আলোচনা সভায় আবুল মোমেন বলেন, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু হওয়ার পর তা মানুষের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আনে। ফটোগ্রাফি আসার আগে মানুষ ছবি এঁকেই সবকিছু প্রকাশ করত। কিন্তু ফটোগ্রাফি আসার পর মানুষ জগৎকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে দেখার সুযোগ পায়। যেমন আগে দৌড়ানোর সময় ঘোড়ার পা চারদিকে ছড়ানো অবস্থায় আঁকা হতো, কিন্তু ফটোগ্রাফি প্রমাণ করে দিল যে লাফ দেওয়ার সময় ঘোড়ার চার পা এক জায়গায় চলে আসে। একইভাবে ট্রেনের ধোঁয়ার গতির বিষয়েও ফটোগ্রাফি আমাদের দৃষ্টিকে সুনির্দিষ্ট করেছে।’
আবুল মোমেন আরও বলেন, ফটোগ্রাফির এই নিখুঁত বাস্তবতার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে চিত্রশিল্পীরা ‘ইমপ্রেশনিজম’ ও ‘এক্সপ্রেশনিজম’–এর মতো নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। শিল্পীরা তখন বস্তুর হুবহু রূপের বদলে দৃশ্যের ভেতরের ভাব, রঙের খেলা ও আলোর প্রতিফলনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এভাবে ফটোগ্রাফি এগোতে থাকে।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘সৌরভ গত ১৫ বছর ধরে আমাদের সঙ্গে আছে। দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে সে প্রথম আলোর তিনবার সেরা আলোকচিত্রী হওয়ার পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও লাভ করেছে।’
সৌরভ দাশের আলোকচিত্রের মূল্যায়ন করে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘সৌরভ “ভাসমান নায়ক” শিরোনামে একগুচ্ছ ছবি তুলেছে। এই সিরিজে সমাজের এক গভীর বৈপরীত্য উঠে এসেছে। এখানে খোকন নামের এক যুবকের কথা বলা হয়েছে, যে প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা মাথায় বহন করে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। কিন্তু দিন শেষে তার নিজের ঘুমানোর কোনো জায়গা নেই; তাকে ফুটপাতে রাত কাটাতে হয়। এভাবে সাধারণ ও মেহনতি মানুষের জীবনের এই গল্পগুলো তুলে আনার মাধ্যমে সৌরভ মূলত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বা কামরুল হাসানের সেই মেহনতি মানুষের কাছে যাওয়ার দর্শনকেই তুলে ধরেছে।’
মতিউর রহমান আরও বলেন, ‘আলোকচিত্র সব সময়ই আমাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিজয়কে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের ছবিগুলো নিয়ে আমরা একটা বই প্রকাশ করেছি। ছবিগুলো দেখলে এখনো মনে হয়, কী ধরনের ঘটনা আমাদের এখানে ঘটে গেছে। আর আমাদের আলোকচিত্রীরা সাহস নিয়েই এ ছবিগুলো তুলেছিল। বইয়ে সৌরভ দাশের ১৫টি ছবি রয়েছে।’
অনুষ্ঠানে আলোকচিত্রী ও শিক্ষক শোয়েব ফারুকী বলেন, ‘২০১১ সালে ফটো ব্যাংক গ্যালারিতে ফটোগ্রাফির বেসিক ক্লাসে সৌরভের সঙ্গে আমার পরিচয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার চোখে ও কৌতূহলে একধরনের গভীরতা লক্ষ করি।’
বাফার সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম বলেন, বন্দর নগরী হওয়ার পরও চট্টগ্রাম এখনো নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। এটি একটি অবহেলিত শহর। সৌরভের ছবিতে শহরের নানা দিক উঠে এসেছে। প্রথম আলোও সেসব ছবি গুরুত্ব দিয়ে ছাপিয়েছে।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখা গেছে, সৌরভ দাশের ছবিতে মানুষ ও প্রকৃতি দুটিই আছে, কিন্তু মুখ্য হয়ে ওঠে সময়। ‘স্লো শাটারের’ ভেতর দিয়ে তিনি ধরে আনেন চলমান জীবনের গতি, যেখানে মানুষ কখনো স্পষ্ট নয়, কখনো আলোছায়ায় ভেঙে যায় অবয়ব। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া তাঁর ছবিতে স্থিরতা নেই, আছে প্রবাহ। কোথাও মানুষের চলাচল রূপ নেয় রঙের রেখায়, কোথাও আলো নিজেই হয়ে ওঠে চরিত্র।
এই প্রদর্শনীর ছবিগুলো দেখলে মনে হয় দৃশ্যগুলো চেনা, কিন্তু নতুন। কারণ, সৌরভ দাশ বাস্তবতাকে দেখেন ভিন্ন ভঙ্গিতে। বিমূর্ত ভাবনার ভেতর দিয়ে তিনি বাস্তব দৃশ্যকেই অনুবাদ করেন নতুন ভাষায়। তাঁর ছবিতে গল্প বলা হয় শব্দ ছাড়াই, ব্যাখ্যা ছাড়াই, দর্শককে ভাবতে ছেড়ে দিয়ে।