একসময়ের শান্তিময় শহর কুমিল্লায় এখন যানজট–জলজট ও জনজট

আহসানুল কবীর
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

সেই কবে কোনো এক কবি লিখেছিলেন, ‘কুমিল্লার শ্যামল মায়ায় মেঘনা উদাস/ কণ্ঠে তার মণিহার গোমতী–তিতাস।’ আজ কুমিল্লার মানুষ আরও বেশি উদাস। তবে সেই উদাসীনতার কারণ হারিয়ে যাওয়া শ্যামল মায়া, সবুজে ছাওয়া পরিচ্ছন্ন, নিরিবিলি, শান্তিময় এক শহরের স্মৃতি।

৩০-৪০ বছর আগেও কুমিল্লা ছিল শান্তির শহর, স্বস্তির শহর। তারও আগে ছিল ব্যাংক ও ট্যাংকের (জলাশয়) শহর, শিল্প ও সংস্কৃতির শহর। আজ সবই কেবল স্মৃতি।

কবে শুরু, কেউ জানে না

চাকলা রওশনাবাদের মেহেরকুল পরগনার (অবিভক্ত বাংলার জমিদারি পরগনা) এই শহরের গোড়াপত্তন ঠিক কবে, তার কোনো সর্বজনস্বীকৃত তথ্য নেই। তবে ১৪৫৮ সালে ত্রিপুরার রাজা ধর্ম মাণিক্য বাহাদুরের খনন করা ধর্ম সাগর ও নানুয়া দিঘি শহরের সবচেয়ে প্রাচীন পুরাকীর্তি। জনবসতি ছিল বলেই দিঘি খনন করা হয়েছিল, এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। পাশের কোটবাড়ী সভ্যতার বয়স প্রায় ১ হাজার ২০০ বছর, চণ্ডীমুড়ার প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছর।

মোগল আমলে এখানে সামরিক ঘাঁটি ছিল। তার প্রমাণ ১৬৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহ সুজা মসজিদ, মোগলটুলী ও সুজানগর। তবে শহরের প্রকৃত বিকাশ শুরু ১৭৯০ সালে ত্রিপুরা জেলা গঠনের পর। যদিও শত শত বছর আগেই শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে মৌর্য আমলে প্রতিষ্ঠিত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড।

কুমিল্লা ছিল ত্রিপুরা জেলার সদর দপ্তর। প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি মেঘনা, ডাকাতিয়া, গোমতী ও তিতাসের সংযোগে গড়ে ওঠা উন্নত নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা ছিল। শিক্ষা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর বসবাসের মনোরম পরিবেশ ছিল। এসব কারণে শহরটি দ্রুত বিকশিত হয়। গড়ে ওঠে ছিমছাম, পরিকল্পিত এক আবাসিক শহর। নানা এলাকা থেকে জমিদার ও অভিজাতরা এসে এখানে বসতি গড়েন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও শিল্প–সংস্কৃতির শহর

কুমিল্লা শহরে এখন পাকা ভবনের সংখ্যা ৫০ হাজারের কাছাকাছি
ছবি: প্রথম আলো

শহরের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গিরিধারী স্কুল, ১৮৩৭ সালে জিলা স্কুল, ১৮৭৩ সালে ফয়জুন্নেছা স্কুল, ১৮৭৮ সালে বঙ্গবিদ্যালয়, ১৮৭৯ সালে ইউসুফ স্কুল এবং ১৮৯৯ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছিল কুমিল্লা থেকেই।

আরও পড়ুন

১৯৩০ সালের আগে-পরের সময়টা ছিল শিল্প-সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, সংগীতশিল্পী শচীন দেববর্মন, ওস্তাদ জানে আলম চৌধুরী ও হিমাংশু দত্তের শহর কুমিল্লা। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিকশিত হওয়ার শহরও এই কুমিল্লা।

সংখ্যা বেড়েছে, মান কমেছে

১৮৬৪ সালের ৩০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা দেশের প্রথম চারটি মিউনিসিপ্যালিটি। নবদ্বীপ বর্মন, নবাব হোচ্ছাম হায়দার ও অতীন্দ্র মোহন রায়ের মতো ব্যক্তিরা এই পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন।

কুমিল্লার তৎকালীন জেলা সার্ভেয়ার জে জে কামিন্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬৫ সালে শহরে পাকা বাড়ি ছিল ২৪টি, ১৮৯৫ সালে মাত্র ৫৫টি। জে ই ওয়েবস্টারের টিপারা গেজেটিয়ার অনুসারে, ১৮৮১ সালে কুমিল্লা শহরের জনসংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৩৭২ এবং ১৮৯১ সালে ১৪ হাজার ৬৮০ জন।

প্রাচীন ধর্মসাগর দিঘি আজও যেন কুমিল্লা শহরের ফুসফুস হয়ে টিকে আছে
ছবি: প্রথম আলো

সেই শহরে এখন বাস করেন ১০ লাখের বেশি মানুষ, পাকা ভবনের সংখ্যা ৫০ হাজারের কাছাকাছি। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, জনসংখ্যা ও অট্টালিকার সংখ্যা ছাড়া আর তেমন কোনো সূচকেই শহরটি এগোতে পারেনি, বরং পিছিয়েছে। ২০১১ সালে ৫৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে সিটি করপোরেশন হলেও বেড়েছে যানজট, জলজট ও জনজট। পুরো শহর পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। সড়ক দখল করে আছেন হকাররা, ফুটপাত বলে কিছু নেই।

উত্তরণের পথ

এই সংকট থেকে উত্তরণের সুযোগ এখনো আছে। সিটি করপোরেশনের সীমানা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি গঠন করা হয়েছে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসা (পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ)। সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক দুজনই বয়সে নবীন, এই শহরেরই সন্তান। তাঁদের উদ্যম আছে, শহরের সমস্যা সম্পর্কেও তাঁরা জানেন। সিটি করপোরেশন প্রশাসকের বেশ কিছু উদ্যোগ জনগণের সাধুবাদ পেয়েছে।

শহরকে আবার বাসযোগ্য করে তুলতে সবার আগে দরকার উন্নয়নসংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আগামী ১০০ বছরের উপযোগী একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। দখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধার করে পূর্ণাঙ্গ জলাধার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। যেখানে–সেখানে ময়লা ফেলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি, যা থেকে আয়ও হতে পারে।

সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকারদের সরাতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তবে উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসনের মাধ্যমেই তা করতে হবে। একই সঙ্গে যান চলাচলও শৃঙ্খলায় আনতে হবে। এ ছাড়া পয়ো ও পানিনিষ্কাশনে আধুনিক পদ্ধতি চালু করতে হবে এবং ভবনমালিকদের তা মানতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কোটবাড়ী থেকে লালমাই পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান করে একটি স্যাটেলাইট সিটি (উপশহর) গড়ে তোলা যেতে পারে। আগামী ২০০ বছরের উপযোগী করে এর পরিকল্পনা এখনই করতে হবে। পাশাপাশি জনসংখ্যার চাপ কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কার্যালয়, হাসপাতাল, বাজার, বিনোদনকেন্দ্র ও মিলনায়তন দ্রুত বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। এতে শহরে নতুন মানুষের স্রোত ঠেকানো যাবে।

এসবের বাস্তবায়ন হলে রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের মাঝখানে কুমিল্লা হয়ে উঠবে সত্যিকারের আবাসিক রাজধানী। কাজটি কঠিন, কিন্তু অসাধ্য নয়। কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই এগোতে হবে সুন্দর, সমৃদ্ধ আগামীর পথে।


আহসানুল কবীর, ইতিহাসবিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠক
তথ্যসূত্র
১. কুমিল্লা জেলার ইতিহাস, আ ক ম যাকারিয়া (১৯৮৪)
২. টিপারা গেজেটিয়ার, জে ই ওয়েবস্টার (১৯১০)
৩. বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার: কুমিল্লা (১৯৮১)
৪. কুমিল্লার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, আহসানুল কবীর (২০১৮)