কর্মস্থলে যোগ দিতে আসা প্রধান শিক্ষককে বের করে দেওয়া হলো ধাক্কা দিয়ে

চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হকে বিদ্যালয় থেকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন যুবকছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

শিক্ষা বোর্ডের চিঠি নিয়ে কর্মস্থলে যোগদান করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক। আজ রোববার দুপুরে বিদ্যালয়ে যোগ দিতে গেলে তাঁকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ওই শিক্ষক।

এ ঘটনার সময় উপস্থিত একজনের মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে পরিচালনা কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ, প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হকসহ বেশ কয়েকজনের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে। একপর্যায়ে পেছন থেকে কয়েকজন ব্যক্তি এসে মো. মোজাম্মেল হককে ধাক্কা দিতে থাকেন। এরপর আরও কয়েকজন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বিদ্যালয়ের বাইরে বের করে দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন মো. মোজাম্মেল হক। তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগমও বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট মোজাম্মেল হক ও তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগম পদত্যাগ করেছেন বলে দাবি বিদ্যালয়ের গভর্নিং কমিটির। অন্যদিকে মো. মোজাম্মেল হকের দাবি, তিনি পদত্যাগ করেননি। তাঁকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও আরবিট্রেশন কমিটির চিঠি পেয়ে তিনি কর্মস্থলে যোগদান করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার পর বের করে দেওয়া হয়।

অপর দিকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা বলছেন, মো. মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তিনি তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগমের নামে বিদ্যালয়ের জায়গা মাছ চাষের কথা বলে দখল করেছেন। শিক্ষকদের আবাসনের স্থান অস্তিত্বহীন এক নারীর নামে বরাদ্দ দিয়েছেন। প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশংসাপত্র বাবদ টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ও তাঁর স্ত্রী বিভিন্ন সময় বিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন জেলা প্রশাসনের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার রাকিবুল ইসলাম। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মো. মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে মোট ২৩টি অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়। আর্থিক দুর্নীতির বিস্তারিত তদন্ত করতে আর্থিক লেনদেনের ফার্ম দিয়ে অডিটের সুপারিশ করা হয়।

জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের গভর্নিং কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তিনি ও তাঁর স্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আর্থিক দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে। অডিট করেও তাঁর বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত ও অডিট রিপোর্ট থাকার পরও মন্ত্রণালয় কিংবা বোর্ড কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আজ তিনি স্থানীয় লোকজন সঙ্গে নিয়ে যোগদান করতে এলে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করে।

অভিযোগের বিষয়ে মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘যারা আমাকে হেনস্তা করেছে তাদের সন্তানেরা একসময় বিদ্যালয়ে পড়ত। ৫ আগস্টের পর যারা মব করেছিল তারাই আজকের ঘটনার সময় ছিল। আমি বোর্ডের চিঠি পেয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। তারা যোগদান করতে দেবে না, আমি নিশ্চিত ছিলাম। তবে শারীরিক লাঞ্ছনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি বোর্ডে বিষয়টা জানাব এবং নিরাপত্তার জন্য থানায় যাব। আমার সঙ্গে বহিরাগত কেউ ছিল না। তারা সবাই অভিভাবক।’

বোর্ড জানায়, আপিল ও আরবিট্রেশন কমিটি মো. মোজাম্মেল হকের বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত দিয়েছে। যে পরিপত্রের আলোকে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে সেটি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের। সেখানে বলা হয়েছে, স্বীকৃত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। না হলে ১৮০ দিন পরে তাঁরা স্বপদে পুনর্বহাল হবেন এবং বেতন পাবেন। মূলত এই পরিপত্রের আলোকে মোজাম্মেল হক এবং তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগমকে পুনরায় কর্মস্থলে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আপিল ও আরবিট্রেশন কমিটির ৪৯তম সভায় মো. মোজাম্মেল হক ও তাঁর স্ত্রীর পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এটি যেহেতু আদালতের রায়ের মতো, এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে হলে হাইকোর্টে যেতে হবে। সিদ্ধান্ত পেয়েই তিনি গিয়েছিলেন। তবে যোগ দিতে পারেননি বলে শুনেছি।’