বারবিকিউ-লেজার শোর জন্য পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিনে যাবেন কেন: পরিবেশসচিব
দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ পাথুরে দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বারবিকিউ, লেজার শো করার জন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা আছে। এসব আনন্দ–ফুর্তি করার জন্য পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যাবেন কেন? ব্যবসার নামে সেন্ট মার্টিনে আর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো যাবে না।’
আজ বুধবার দুপুরে কক্সবাজার সৈকতের একটি তারকা হোটেলের বলরুমে ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন পরিবেশসচিব। পরিবেশ অধিদপ্তর এ কর্মশালার আয়োজন করে।
ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটক সীমিত রেখে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নেও প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু অতীতে মানুষের নিষ্ঠুর ও অপরিকল্পিত আচরণে দ্বীপটি তার জীববৈচিত্র্যের বড় অংশ হারিয়েছে। পর্যটনকে ঘিরে যত্রতত্র হোটেল–রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। হোটেলমালিকেরা ব্যবসা করলেও ময়লা–আবর্জনা পরিষ্কার করেন না। এসব বর্জ্য সাগরের পানি দূষিত করছে।
পরিবেশসচিব বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দরে নামলেই দুর্গন্ধ ও ময়লা–আবর্জনা চোখে পড়ে। চিন্তা ও সংবেদনশীলতার দিক থেকে আমরা এখনো দরিদ্রই রয়ে গেছি।’ তিনি বলেন, সেন্ট মার্টিনে কারা যান, কেন যান, তাঁদের বয়স কত—এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। শুধু হিসাব–নিকাশের জন্য ব্যবসা করলে চলবে না; পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেন্ট মার্টিন একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা—এ কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামানের সভাপতিত্বে দিনব্যাপী কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজী মো. ওয়ালি–উল–হক, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দিন আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহমেদ পেয়ার এবং পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন।
কর্মশালার শুরুতে ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন’ প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুল হাসান। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেন্ট মার্টিনের সুরক্ষায় ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কেয়াবন সৃষ্টি, বনায়ন, সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার স্থান সুরক্ষা, ময়লা–আবর্জনা পরিষ্কার এবং স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসনের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে শিলবুনিয়া ও দিয়ারমাথা এলাকায় সামুদ্রিক কাছিম ৯০৪টি ডিম পেড়েছে। ডিমগুলো সংরক্ষণ করে হ্যাচারিতে বাচ্চা ফুটানোর ব্যবস্থা নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
কর্মশালায় ব্র্যাকের কার্যক্রম নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দেন সংস্থাটির প্রতিনিধি সংকলিতা সোম।
দুপুরে মুক্ত আলোচনায় আশির দশকের সেন্ট মার্টিনের চিত্র তুলে ধরেন পরিবেশ ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খান। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৮০ সাল থেকে সেন্ট মার্টিনকে চিনি। আগের সেই সেন্ট মার্টিন এখন আর নেই। প্রবাল, শৈবাল ও বনজ জীববৈচিত্র্য বলতে গেলে বিলুপ্ত।’ একসময় দ্বীপটি ছিল প্রকৃতির স্বর্গ, এখন তা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. আলী রেজা খান বলেন, গত এক বছরে পর্যটক যাতায়াত সীমিত থাকায় অনেক গাছপালা আবার মাথা তুলেছে। কাঁকড়া রক্ষায় গবেষণা প্রয়োজন। তবে ছেঁড়াদিয়াতে কোনো বনায়ন নয়। তিনি আরও বলেন, হোটেল–রিসোর্ট তৈরির জন্য অতীতে বহু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। দ্বীপে আর নতুন হোটেল করা যাবে না। সেন্ট মার্টিনকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করে দক্ষিণ দিকের তিনটি অঞ্চলে গড়ে ওঠা হোটেল–রিসোর্ট উত্তর দিকে সরিয়ে নিতে হবে। রাতে আলো জ্বালিয়ে বারবিকিউ করা কাঁকড়া ও সামুদ্রিক কাছিমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে—এগুলো বন্ধ করতে হবে।
কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকার দুই বছর ধরে পর্যটকদের জন্য তিন মাস—নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন উন্মুক্ত রেখেছে। স্থানীয়দের জীবিকা ও পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে এ সময়সীমা ছয় মাস করা দরকার। তিনি বলেন, সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দাদের জন্য ঘর নির্মাণে একটি নীতিমালা প্রয়োজন। একই নকশা ও একই রঙের কটেজ আকৃতির ঘর হলে একদিকে স্থানীয়দের আয় বাড়বে, অন্যদিকে দ্বীপটি দেখতে আরও আকর্ষণীয় হবে।
মুক্ত আলোচনায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সৈকতে কাঁকড়া–শামুক–ঝিনুক রক্ষায় ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ, সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা, কেয়াবনের পাশাপাশি নিশিন্দাগাছ রোপণ, পর্যটকের নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ চৌধুরী, নেকমের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুল কাইয়ুম, সেন্ট মার্টিন দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হাবিব খানসহ অন্যরা।