‘মাটির হাঁড়ি’তে রান্না মাংসের টানে মানুষ ছুটছেন মধুপুরের বনে

চলছে শাকিল আহমেদের মধুবন হোটেল অ্যান্ড টি কর্নারে মাটির হাঁড়িতে রান্না। গত সোমবার টাঙ্গাইলের মধুপুরের মাগন্তিনগরে। প্রথম আলো

মধুপুরের বনের ভেতরের ছোট্ট বাজার সৈদালী। দুপুর গড়ালেই সেখানে দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য। তিন-চারটি দোকানের এই বাজারে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়। কেউ অপেক্ষা করছেন মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংসের জন্য, কেউ আবার বাড়িতে নিয়ে যেতে কিনছেন সেই খাবার।

এই ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দু ২৫ বছর বয়সী শাকিল আহমেদের ‘মধুবন হোটেল অ্যান্ড টি কর্নার’। একসময় গাজীপুরের কোনাবাড়ী শিল্প এলাকায় ছোট একটি খাবারের দোকান ছিল তাঁর। সেই দোকান উচ্ছেদ হওয়ার পর ফিরে আসেন মধুপুরের নিজ গ্রাম মাগন্তিনগরে। শুরু করেছিলেন চায়ের দোকান দিয়ে। সেই দোকান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংসের জন্য তাঁর পরিচিতি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে শাকিলের রান্নার সুনাম। এখন শুধু মধুপুর নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভোজনরসিকেরা ছুটে আসেন প্রত্যন্ত বনাঞ্চলের এই দোকানে।

শাকিল আহমেদের মধুবন হোটেল অ্যান্ড টি কর্নার
ছবি: প্রথম আলো

মাগন্তিনগর গ্রামের বাসিন্দা আবু হানিফ বলেন, শাকিলের মাটির হাঁড়ির মাংসের দোকানের কারণে তাঁদের গ্রামের নাম ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে আসেন। এই দোকান এখন তাঁদের গ্রামের গর্ব।

শাকিলের এই পথচলা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় কাজের খোঁজে কিশোর বয়সেই চলে যান কোনাবাড়ী শিল্প এলাকায়। ২০১৮ সালে সেখানে ছোট একটি খাবারের দোকান চালু করেন। পরিশ্রমে অল্প সময়েই দোকানটি জমে ওঠে। সেখানে কাজ করতে করতেই তিনি শিখে নেন মাটির হাঁড়িতে মাংস রান্নার কৌশল। পাশাপাশি নানরুটি ও বিভিন্ন খাবার তৈরির কাজও আয়ত্ত করেন।

২০২৪ সালে কোনাবাড়ীতে তাঁর দোকানের জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান হয়। ব্যবসা গুটিয়ে শাকিল ফিরে আসেন মধুপুরে। বনাঞ্চলের ভেতরের মাগন্তিনগর গ্রামের সৈদালী বাজারে শুরু করেন চায়ের দোকান। পরে সেখানে মাটির হাঁড়িতে রান্না করা গরু, খাসি, হাঁস ও দেশি মুরগির মাংস বিক্রি শুরু করেন।

মধুপুর সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাশে জলছত্র বাজার। সেখান থেকে বনের ভেতরের পথ ধরে প্রায় তিন কিলোমিটার গেলে সৈদালী বাজার। সেখানেই শাকিলের ছোট্ট দোকান।

গত সোমবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের সামনে কয়েকটি মোটরসাইকেল রাখা। ভেতরে ক্রেতাদের বসার জায়গা নেই। কেউ মাংস রান্না শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে আছেন, কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। চুলায় তখনো মাটির হাঁড়িতে রান্না হচ্ছিল মাংস।

গোপালপুর এলাকা থেকে এসেছিলেন কলেজছাত্র সোহেল রানা। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাকিলের মাটির হাঁড়ির মাংসের কথা জেনে তিনটি মোটরসাইকেলে ছয় বন্ধু এখানে এসেছেন।

একটি ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম বলেন, কাজের প্রয়োজনে মধুপুর এলাকায় এলে তিনি শাকিলের দোকানে খেয়ে যান। তাঁর ভাষ্য, অন্য অনেক রেস্তোরাঁর তুলনায় এখানকার মাংসের স্বাদ ভালো।

কাজের প্রয়োজনে মধুপুর এলাকায় এলে তিনি শাকিলের দোকানে খেয়ে যান। তাঁর ভাষ্য, অন্য অনেক রেস্তোরাঁর তুলনায় এখানকার মাংসের স্বাদ ভালো।
শহিদুল ইসলাম, একটি ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি

শুধু দোকানে বসে খাওয়ার জন্য নয়, বাড়িতে নেওয়ার জন্যও অনেকে মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংস কিনে নিয়ে যান। ঘাটাইল উপজেলা থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে এসেছিলেন রাসেল। আগে থেকে ফোনে বুকিং দিয়ে তিনি দুই কেজি গরুর মাংস নিয়ে যান। দাম দেন ২ হাজার ৮০০ টাকা। রাসেল বলেন, বাড়িতে অতিথি এসেছে। তাই আপ্যায়নের জন্য মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংস নিতে এসেছেন।

টাঙ্গাইল শহর থেকে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, ফেসবুকে এই রেস্তোরাঁর প্রশংসা শুনে ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইল ফেরার পথে তিনি এখানে খেতে এসেছেন।

কোনাবাড়ীর দোকান উচ্ছেদ ও পরে মধুপুরে এসে দোকান করা। সেই দোকান থেকে সাফল্য—এসব নানা বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর কথা হয় শাকিল আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেড় বছরের মধ্যেই তাঁর রেস্তোরাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ১১টা–১২টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলে। প্রতিদিন প্রায় এক মণ গরুর মাংস, ১০ থেকে ১২ কেজি খাসি ও হাঁসের মাংস এবং ৭ থেকে ৮ কেজি দেশি মুরগির মাংস বিক্রি হয়। প্রতি প্লেট মাংসের দাম ২০০ টাকা। রান্না করা গরুর মাংস প্রতি কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং খাসির মাংস প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। ক্রেতার চাপ দিন দিন বাড়ছে। তাই বাবা আসগর আলী ও কলেজপড়ুয়া ছোট ভাই সুমন আহমেদকেও কাজে যুক্ত করেছেন। তাঁরা নিজেরাই রান্না করেন, নিজেরাই পরিবেশন করেন।