সমন্বিত কৃষি আবাদে ‘মরা জমি’ এখন সবুজ

গিয়াস উদ্দিন মাটি খনন করে প্রশস্ত পাড় দিয়ে ঘের তৈরি করেছেন। এই পাড়ে লাগিয়েছেন পেঁপে ক্যাপসিকাম, ব্রকলিসহ বিভিন্ন ফল সবজিছবি: সাইয়ান

বছরের সাত মাস জলাবদ্ধ থাকত করমজা গ্রামের জমি। বোরো ধান ছাড়া অন্য কোনো ফসল হতো না। নিচু জমিতে বৃষ্টির পানি জমে আগাছা জন্মে পতিত পড়ে থাকত অনেক জমি। কৃষকদের কাছে এ জমি ছিল অনুৎপাদনশীল ‘মরা জমি’।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বারৈজ্জাহাট এলাকায় করমজা গ্রামের অবস্থান। ওই গ্রামের সেই ‘মরা জমিকে’ বদলে দিয়েছেন কৃষক গিয়াস উদ্দিন (৫২)। এলাকায় তিনি লিটু নামে চেনেন। নতুন উদ্যোগ ও পরিশ্রমে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, যে জমিকে সবাই ফেলনা ভেবেছিল, সেটিও হতে পারে সোনার খনি। তিনি এই মৌসুমে শুধু লালশাক বুনে বিক্রি করেছেন দুই লাখ টাকা। পাশাপাশি তাঁর বিশাল সবজির খামারে আছে  লাউ,  করলা, শসা, জালি কুমড়া, তরমুজ (অফ সিজনে বারি তরমুজ-১, বারি তরমুজ-২ এবং হাইব্রিড জাত), সাম্মাম, বেগুন, পেঁপে প্রভৃতি। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ৫০টি আমগাছ আছে এই খামারে। আছে তিনটি মাছের ঘেরও। গত আগস্ট থেকে অক্টোবর এই তিন মাসে তিনি লালশাক, লাউ ও লাউশাক বিক্রি করে আয় করেছেন প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। 

গিয়াস উদ্দিন বললেন, এবার আশা করছেন, শাকসবজি, মাছসহ অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা আয় হবে। এতে ব্যয় বাদে তাঁর অন্তত ১৫ লাখ টাকা লাভ থাকবে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্তী এদবর প্রথম আলোকে বলেন, ‘গিয়াস উদ্দিনের চাষাবাদের পদ্ধতি ও সফলতা অভাবনীয়। তিনি আমার দেখা একজন আধুনিক, স্মর্ট কৃষক; যিনি প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের বুদ্ধিমত্তাকে সংযোজন করে সাফল্য পেয়েছেন। তাঁর এই প্রযুক্তি আমরা অন্য এলাকার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’ 

জলমগ্ন জমিতে সাফল্যের গল্প

গিয়াস উদ্দিন একসময় পল্লী বিদ্যুতের ইলেকট্রিশিয়ান ছিলেন। নির্দিষ্ট কোনো বেতন ছিল না—গ্রাহকের বাড়িতে মিটার বসানো, লাইন মেরামতের কাজ করে যতটুকু পারিশ্রমিক পেতেন, তাতে সংসার চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব। হাতে সামান্য আয়, আর ওপরে বড় সংসার। স্ত্রী, এক ছেলে, তিন মেয়ে নিয়ে ছয়জনের সংসারে প্রতিদিনের হিসাব কষতে কষতেই জীবন যেন এক সময় থমকে যায় তাঁর।

বাবা হাশেম আলী রেখে গিয়েছিলেন পাঁচ একর ফসলি জমি। কিন্তু পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হলে গিয়াস পান মাত্র এক একর। তা–ও কোনো কাজে আসে না—এলাকাটি নিচু, সাত মাস জলাবদ্ধ থাকে। বছরে একটিমাত্র ফসল বোরো ধান আবাদ করে সামান্য আয় হতো। এরপর সারা বছরই এই জমি পতিত পড়ে থাকত।  দিন গড়ায়, সংসার বড় হয়, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বাড়তে থাকে। কিন্তু আয়ের উৎস বাড়ে না।

গিয়াস উদ্দিন ভাবতে থাকেন, এভাবে আর কত দিন? সংসারের দায়, ভবিষ্যতের চিন্তা আর অনিশ্চয়তা মিলেমিশে তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।

একদিন হঠাৎ মাথায় এল, যদি পতিত জমিতে বেড কেটে মাচাপদ্ধতিতে কিছু শাকসবজি চাষ করলে কেমন হয়। তাহলে অন্তত পরিবারের প্রয়োজনটা তো মিটবে, তারপর বাড়তি থাকলে বিক্রি করে আবাদের ব্যয়টা ওঠানো যাবে। 

এটা ২০১২ সালের কথা। ওই ভাবনা থেকেই পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের জমির এক কোণে ছোট ঘের করে শুরু করেন শসা, টমেটো, করলা ও তরমুজ (বারি তরমুজ-১, বারি তরমুজ-২ এবং হাইব্রিড জাত) আবাদ করেন। প্রথমবারেই তিনি সফলতা পান। সব মিলিয়ে লাখখানেক টাকা আয় করেন। সেই আয় শুধু টাকা নয়, ছিল নতুন আত্মবিশ্বাসের উৎস।

পরের বছরই গিয়াস বিদ্যুতের কাজ ছেড়ে দেন। পুরোপুরি কৃষিকাজে মন দেন। তবে পরের দুই বছর প্রকৃতি তাঁকে সহজে পথ চলতে দেয়নি—বন্যা, অতিবৃষ্টি আর ক্ষতির হিসাবই যেন ছিল তাঁর দিনলিপি। তবু তিনি হার মানেননি।

২০১৬ সালের সেই ভয়াল বৃষ্টির কথা মনে পড়লে আজও কেঁপে ওঠেন গিয়াস। প্রবল বর্ষণে তাঁর পুরো এক একর জমির শসা, করলা আর সবজির খেত তলিয়ে যায়। সকালে নৌকা নিয়ে খেতে গিয়ে দেখেন, প্রতিবেশী আবদুল আজিজ কাঁদছেন। ‘কাঁদছো কেন?’ জিজ্ঞেস করেন গিয়াস।

চোখ মুছতে মুছতে আজিজ বলেন, ‘তোমার এমন ক্ষতি দেখে মনটা ভেঙে গেছে। জানি না, তুমি কীভাবে সহ্য করবে।’

গিয়াসের উত্তর ছিল শান্ত, কিন্তু দৃঢ়, ‘চিন্তা কোরো না, আমি আবার বীজ বুনব। ঘুরে দাঁড়াব।’ ঠিকই তা–ই করেন তিনি। আবার বীজ বোনেন, আবার চাষ করেন, আবার ঘুরে দাঁড়ান।

এখন গিয়াস উদ্দিনের খামারের পরিধি দেড় একর। নিজের এক একর জমির সঙ্গে আরও ৫০ শতক ইজারা (লিজ) নিয়েছেন। রয়েছে তিনটি মাছের ঘের আর বোরো মৌসুমের জন্য লিজ নিয়েছেন আরও ১০ একর জমি।

কৃষিকাজের আয় সমৃদ্ধি এনেছে তাঁর পরিবারে। ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বারৈজ্জারহাটে পৈতৃক জমিতে আধা পাকা তিনটি স্টল নির্মাণ করে দোকান ভাড়া দিয়েছেন। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। হাতে জমেছে বড় অঙ্কের পুঁজিও। 

গর্বের সঙ্গে গিয়াস বলেন, ‘এখন বুঝি, জীবনে ঝুঁকি না নিলে কিছুই সম্ভব নয়। যে জমিকে সবাই অকেজো বলেছিল, সেই জমিই আজ আমার জীবনের আশীর্বাদ। নিজের বুদ্ধি, ধৈর্য আর পরিশ্রমই আমাকে নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ দিয়েছে।’ 

গিয়াস উদ্দিন কৃষিকাজকে যে শুধু জীবিকার জন্য আঁকড়ে ধরেছেন, তা নয়; বরং কৃষিকে তিনি ধারণ করছেন মনেপ্রাণে। এর প্রমাণ রেখেছেন তিনি ছেলে-মেয়েকে কৃষি বিষয়ে পড়াশোনার জন্য উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে। বড় ছেলে রাকিবুল ইসলাম কৃষি ডিপ্লোমা পাস করে এখন বাবার সঙ্গে খামারে কাজ করছেন। বড় মেয়ে সানজিদা আক্তারের বিয়ে হয়েছে। তিনিও কৃষি ডিপ্লোমা পাস করেছেন। মেজ মেয় লুবনা আক্তার এবার এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। আর ছোট মেয়ে আদুরি আক্তার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। 

গিয়াসের খামারে দুজন শ্রমিক কাজ করেন। সঙ্গে গিয়াস উদ্দিন ও তাঁর বড় ছেলে কৃষিবিদ রাকিবুলও কাজ করেন। খেতে কখন কী পরিচর্যার দরকার, পোকামাকড়ের হাত থেকে কীভাবে সুরক্ষা দিতে হবে, এসব কিছুই বাবা-ছেলে মিলে পরিকল্পিতভাবে করছেন। 

রাকিবুল বলেন, ‘কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। চাকরি জন্য চেষ্টা করব, না হলে আক্ষেপ নেই। পড়াশোনাকে নিজেদের খামারেই কাজে লাগাতে পারব।’

গিয়াস উদ্দিন জলাবদ্ধ জমিকে চাষোপযোগী করতে নিজস্ব এক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। প্রথমে তিনি মাটি খনন করে প্রশস্ত পাড় দিয়ে ঘের তৈরি করেছেন। এই পাড়ে তিনি লালশাক, ধনেপাতা, করলা, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, পেঁপে এবং আমের বাগান করেছেন। এরপর ঘেরের পাড়ে তিনি লতাজাতীয় সবজি, ফল আবাদ করেছেন।

গিয়াস উদ্দিনের চাষপদ্ধতি

গিয়াস উদ্দিন জলাবদ্ধ জমিকে চাষোপযোগী করতে নিজস্ব এক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। প্রথমে তিনি মাটি খনন করে প্রশস্ত পাড় দিয়ে ঘের তৈরি করেছেন। এই পাড়ে তিনি লালশাক, ধনেপাতা, করলা, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, পেঁপে এবং আমের বাগান করেছেন। এরপর ঘেরের পাড়ে তিনি লতাজাতীয় সবজি, ফল আবাদ করেছেন। এরপর বাঁশ পুঁতে ঘেরের মধ্যে জাল দিয়ে তৈরি করেছেন মাচা। এই মাচায় লতাজাতীয় সবজি-ফল বেড়ে ওঠে। আর ঘেরে চাষ করেছেন কার্পজাতীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। সমন্বিত এই কৃষি আবাদপদ্ধতিই তাঁকে সমৃদ্ধির এ অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি খাতের বিপর্যয় ঠেকাতে অভিনব অভিযোজনের পথ দেখাচ্ছে। 

বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাহিদ বিন রফিক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকায় বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে, জন্মায় জলজ উদ্ভিদ। ফলে এসব জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। করমজা এলাকায় এ ধরনের অন্তত ৫০০ একর জমি রয়েছে, যা বছরের সাত মাসই পতিত পড়ে থাকে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এমন জমিকে আবাদযোগ্য করতে ‘সরজান’ ও ‘ঘের’ পদ্ধতির চাষাবাদ উদ্ভাবন করেছে। কিন্তু স্থানীয় কৃষক গিয়াস উদ্দিন নিজের বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে এই দুই পদ্ধতির মিশেলে এমন একটি কৃষি মডেল তৈরি করেছেন, যা পতিত জমিকে বহু ফসলি করে তুলেছে—এটি নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ সাফল্য।

কৃষক গিয়াস উদ্দিন নিজের বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে এই দুই পদ্ধতির মিশেলে এমন একটি কৃষি মডেল তৈরি করেছেন, যা পতিত জমিকে বহু ফসলি করে তুলেছে—এটি নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ সাফল্য।
নাহিদ বিন রফিক, বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা কৃষিবিদ

পথ দেখাচ্ছেন অন্যদেরও

গিয়াস উদ্দিন জানালেন, ‘এখন শীতের সবজিগুলোও আসছে—টমেটো, ব্রকলি, ক্যাপসিকাম, শিম, বরবটি—সবই হবে নিজের জমিতে। প্রতিবছর আমার খামার থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ টমেটো বিক্রি হয়।’ 

গিয়াস উদ্দিনের এই খামার শুধু নিজের জীবনের চিত্রই নয়, আশপাশের কৃষকদের জন্যও এক প্রেরণার গল্প। গত পাঁচ বছরে এখানে অন্তত ২০ জন কৃষক তাঁর অনুপ্রেরণা ও পরামর্শে গড়ে তুলেছেন মাচাপদ্ধতির কৃষি খামার। এঁদের মধ্যে হাতেম আলী, কবির হোসেন, জাহাঙ্গীর মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন, রুহুল আমিন অন্যতম। এ ছাড়া বরগুনার পাথরঘাটা, গৌরনদীর মাহিলারায় বেশ কয়েকজন গিয়াস উদ্দিনের পরামর্শ নিয়ে কৃষিখামার গড়ে তুলে সাফল্য পেয়েছেন। 

হাতেম আলী বলেন, ‘আমরা গিয়াস উদ্দিনের দেখাদেখি তাঁর পরামর্শ নিয়ে কৃষিখামার গড়ে তুলেছি। আপাতত দুই বছর ধরে আমি ৫০ শতক জমিতে কৃষিখামার করে বেশ সফলতা পেয়েছি।’ 

পাশের কড়াপুর গ্রামের কবির হোসেন বলেন, ‘গিয়াস উদ্দিনের পরামর্শ নিয়ে আমি ৬০ শতক জমিতে তিন বছর ধরে সবজির খামার করেছি। এখন আর জমি পরিত্যক্ত থাকে না। সংসারেও সমৃদ্ধি ফিরেছে। এই  কৌশল সবার জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। সবাই এই পদ্ধতিকে অনুসরণ করলে আর কোনো জমিই পতিত থাকবে না।’