গণ-অভ্যুত্থানে পঙ্গু ছেলে, খালেদা জিয়ার জানাজায় স্বামীর মৃত্যুতে দিশাহারা তাহেরা
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে ছেলে তাহসীন হোসেন (১৫)। এখনো সে চিকিৎসাধীন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। এরই মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে মারা গেলেন স্বামী মো. নিরব হোসেন (৫৬)।
এমন অবস্থায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে তাহেরা বেগমের (৪০)। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। পঙ্গুত্ব বরণ করা ছেলে তাহসীন, মেয়ে নাফিজা নওরীনসহ তিন সদস্যের সংসার কীভাবে চলবে, এ নিয়ে দুশ্চিতা কাটছে না তাঁর।
নিরব হোসেনের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের বড়ডালিমা গ্রামে। গতকাল বিকেলে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে মারা যান নিরব হোসেন। আজ বৃহস্পতিবার বেলা দুইটায় স্থানীয় বড় ডালিমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক অনটনের কারণে বেশ আগেই ঢাকায় পাড়ি জমান নিরব হোসেন। ঢাকার বড় মগবাজার এলাকার ডাক্তার গলিতে একটি ভাড়া বাসায় দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন নিরব হোসেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সংসার চালাতেন। উপার্জন সামান্য হলেও সুখেই ছিল পরিবারটি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, পরিবারের কাউকে না জানিয়েই একমাত্র ছেলে তাহসীন হোসেন (নাহিয়ান) জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার সঙ্গে অংশ নেয়। ৪ আগস্ট বিকেলে ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তাহসীন হোসেন। সরকারিভাবে দেশে ও বিদেশে (থাইল্যান্ড) নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাহসীন হোসেন তখন নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আছে তার।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবাকে শেষবিদায় জানাতে বাড়িতে এসেছিল তাহসীন হোসেন। সেখানে সে বলে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই সে হাঁটতে পারে না। এমনকি প্রকৃতির ডাকও বুঝতে পারে না। তার বাবাই তাকে দেখভাল করতেন। গতকাল যখন বাবার মৃত্যুর খবর পায়, তখনো সে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন ছিল।
মঙ্গলবার রাতে বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয় তাহসীন হোসেনের। এ প্রসঙ্গে সে বলে, ‘বাবা ফোন করে জানতে চেয়েছেন, হাসপাতালে কেমন আছি, রাতে খাবার খেয়েছি কি না। বাবার মৃত্যুর পর জানি না এখন আমাদের সংসার কীভাবে চলবে? আমার দেখভাল কে করবে?’
তাহেরা বেগম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে একমাত্র ছেলেটা পঙ্গু হয়ে গেছে। হাঁটতে পারে না। কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গেছে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ারও মতো সামর্থ্য নেই ওর। শিশু বাচ্চাদের মতো প্যাম্পার্স পরিয়ে রাখতে হয়। খুবই দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয় তাঁদের। চার সদস্যের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন স্বামী নিরব হোসেন। তিনি মারা যাওয়ায় তিন সদস্যের সংসার চালানোর মতো কোনো সামর্থ্য নেই তাঁর।
নিরব হোসেনের জানাজায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ও পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলম তালুকদার জানাজায় অংশ নেন।
বিএনপি নেতা আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, তিনি তারেক রহমানের নির্দেশে জেলা বিএনপির নেতাদের নিয়ে এসেছেন নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। বিএনপি ও তারেক রহমান সব সময় নিরব হোসেন ও জুলাইযোদ্ধা তাহসীন হোসেনের পরিবারের পাশে থাকবেন।