বগুড়ায় তারেক রহমানের আসনে নির্ভার বিএনপির নেতা-কর্মীরা
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জেলা বগুড়া দলটির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সবগুলো জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া-৬ (বগুড়া পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত) আসনে বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটিতে ধানের শীষ নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
এবার এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইতিমধ্যে তিনি বগুড়া সফরে এসে ‘ঘরের ছেলে’ হিসেবে ভোটারদের কাছে ভোট চেয়েছেন। তারেক রহমানের সফরের পর থেকেই চাঙা ধানের শীষের ভোটের মাঠ। উজ্জীবিত নেতা–কর্মীরাও। স্থানীয় বিএনপিতে নেতৃত্ব নিয়ে বিভেদ থাকলেও তারেক রহমানকে জেতাতে ভোটের মাঠে একাকাট্টা সবাই। প্রচার–প্রচারণার শেষ দিনে শহরে ছাড়াও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ধানের শীষের মিছিল-সমাবেশ হয়েছে। তারেক রহমানের বিজয় নিয়ে নির্ভার বগুড়া বিএনপি।
প্রচারের শেষ দিন আজ সোমবার বগুড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় তারেক রহমানের পক্ষে বিএনপির মিছিল, শোভাযাত্রা ও উঠান বৈঠক হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে দেখা গেছে বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম, শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি সিপার আল বখতিয়ারসহ স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মীদের।
এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি তারেক রহমান বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত জনসভায় বগুড়াকে ‘নিজের ঘর’ অভিহিত করে বক্তব্য দেন। ৩১ জানুয়ারি বগুড়ায় হোটেল নাজ গার্ডেনে আয়োজিত নিজের নির্বাচনী এলাকা বগুড়া-৬ (সদর) আসনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন। এ সময় তারেক রহমান বলেন, ‘এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বসে থাকলে চলবে না, সবার কাছেই যেতে হবে। বগুড়ার সাতটি আসনে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করতে হবে। ধানের শীষকে বিজয়ী করতে পরিশ্রম করতে হবে। মানুষের কাছে যেতে হবে। বিএনপির ঘাঁটি বগুড়া, সামনে ভোটের মাধ্যমে দেখিয়ে দেন, বগুড়া সত্যিকারে বিএনপির ঘাঁটি। এই ঘাঁটি রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের। বগুড়া-৬ আসন আপনাদের কাছে সঁপে দিয়ে গেলাম।’
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, বগুড়া শুধু বিএনপির দুর্গ নয়, বিএনপির রাজনীতির তীর্থস্থান এবং ধানের শীষের শক্ত ঘাঁটি। যত গুজবই ছড়ানো হোক, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে ভোটাররা প্রমাণ করে দেবেন, বগুড়া শুধু বিএনপির ঘাঁটি নয়, শক্ত ঘাঁটি।
বগুড়া শহরের বিভিন্ন মহল্লা, শহরতলি এবং সদর উপজেলার অন্তত ৪০ জন ভোটারের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। ভোটারদের অনেকে অতীতের ফলাফল তুলে ধরে জানান, এ আসনটি ১৯৯১ থেকেই ধরে রেখেছে বিএনপি। এর মধ্যে ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল। বেশির ভাগ নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনেও বিএনপি হাতে গোনা যে দু-একটি আসন পেয়েছিল, এর মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
রিটানিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমান ছাড়াও বগুড়া-৬ আসনে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের প্রার্থী ও জামায়াতের বগুড়া শহর শাখার আমির আবিদুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী (হাতপাখা) আবু নুমান মো. মামুনুর রশিদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (তারা) আবদুল্লাহ-আল-ওয়াকি এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) দিলরুবা নূরী (মই)।
বগুড়া শহরের মালতিনগর এলাকার ভোটার মানিক হোসেন বলেন, এবার ভোটে আওয়ামী লীগ নেই। তারেক রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত জামায়াতের আবিদুর রহমানের। তবে অতীতের নির্বাচনে এখানে ধানের শীষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান লাখের ওপরে। জামায়াতের ভোট বেড়েছে সত্যি, তবে অতীতের নির্বাচনে এত বেশি ভোটের ব্যবধান ঘুচিয়ে ধানের শীষকে পরাজিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বগুড়া–৬ আসনে আওয়ামী লীগের ৭০ থেকে ৭৫ হাজার ভোট রয়েছে। এই ভোট ‘বড় ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে ভোটারদের বেশির ভাগই ইঙ্গিতে জানিয়েছেন, তাঁরা তারেক রহমানকেই ভোট দিতে পারেন। সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণ ভোটার নাফিউল সাদিক বলেন, ‘এবারই প্রথম ভোটার হয়েছি। ভোটটা নষ্ট করতে চাই না। একজন প্রার্থী বিজয়ী হলে সরকারপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে জীবনের প্রথম ভোট তাঁকে দিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকতে চাই।’
তরুণ ভোটার রোমেল হোসেন জানান, বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের পক্ষ থেকেই বগুড়ায় বিমানবন্দর চালু, স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ চালু, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সিটি করপোরেশনসহ উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যে প্রার্থীকে ভোট দিলে এসব দাবি দ্রুত পুরুণ হবে, তাঁকেই ভোট দেবেন বলে জানান রোমেল।
এদিকে বগুড়াকে জামায়াতের ‘আদি দুর্গ’ হিসেবে দেখছেন দলটির স্থানীয় নেতারা। প্রচারের শুরু থেকেই তারেক রহমানের আসনটিতে বড় বড় মিছিল করে চমক দেখিয়েছে দলটি। প্রচারণার শেষ দিনেও জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমানের পক্ষে শহরে বিশাল মিছিল বের করা হয়।
জামায়াতের বগুড়া শহর শাখার সেক্রেটারি আ স ম আবদুল মালেক বলেন, ‘বগুড়া ছিল মূলত জামায়াতের আদি দুর্গ। এবারের নির্বাচনে মানুষ পরিবর্তন চায়। বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুই দলের শাসনব্যবস্থা দেখেছে মানুষ। এখন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের প্রতি স্বতঃফূর্ত ভরসা রাখতে চায়। মানুষ যে পরিবর্তন চায়, এ সুযোগে বগুড়ায় দলের আদি দুর্গ আমরা ফেরত আনতে চাই। শুধু বগুড়া সদর নয়, জেলার সাতটি সংসদীয় আসনেই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আমরা।’