এক কেজি আলু বেচে এক কাপ চা হয় না

আলু তুলতে ব্যস্ত নারীরা। শনিবার তারাগঞ্জের মাটিয়াল পাড়া মাঠেছবি: প্রথম আলো

এক কাপ চায়ের দাম ১০ টাকা। অথচ এক কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকায়। এমন বৈপরীত্যে হতাশ রংপুরের তারাগঞ্জের আলুচাষিরা। উৎপাদন খরচই যেখানে ওঠে না, সেখানে লাভ তো দূরের কথা। লোকসানের বোঝা টানতেই হাঁপিয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবারও একই শঙ্কা ঘিরে ধরেছে তাঁদের।

তারাগঞ্জ উপজেলার প্রামাণিকপাড়া গ্রামের কৃষক আনারুল ইসলাম বলেন, ‘এক কেজি আলু বেচে এক কাপ চা হয় না। তবু ক্রেতা নাই। গত বছর আলুতে ২ লাখ টাকা লস করছি। এবারও যদি লস হয়, পথে বসতে হবে।’

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এতে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু। কিন্তু তারাগঞ্জে তিনটি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ১৬ হাজার টন। ফলে বাকি ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫ টন আলু কৃষকেরা বাড়িঘর, উঠান ও অস্থায়ী গুদামে সংরক্ষণ করেন। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় অনেক আলু পচে যায়। এতে অনেকে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। হিমাগারে রাখা আলুর ভাড়াও অনেকের পক্ষে তোলা সম্ভব হয়নি।

কৃষি বিভাগ জানায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর আলুর আবাদ কিছুটা কমে ৩ হাজার ৪৬৩ হেক্টরে হয়েছে। তবে মৌসুমের শুরুতেই বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ টাকা খরচ হলেও বাজারে দাম পাওয়া যাচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকা।

বামনদীঘি গ্রামের কৃষক সোনা মিয়া জানান, চলতি মৌসুমে এক একর জমি ইজারা নিতে হয়েছে ৩২ হাজার টাকায়। চাষ বাবদ খরচ হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার, উপখাদ্য সাড়ে ৬ হাজার, বীজ বাবদ ৫০ হাজার, রোপণের শ্রমিকের জন্য ৪ হাজার ৮০০ টাকা, রাসায়নিক সার ১৩ হাজার ৬০০ টাকা, আলু বাঁধা ৮ হাজার ৪০০ টাকা, সেচ শ্রমিকসহ ৪ হাজার টাকা, ওষুধ স্প্রে শ্রমিকসহ ১৬ হাজার, আলু উত্তোলন বাবদ ৯ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এক একরে প্রায় ৯ হাজার কেজি আলু পেয়েছেন। সেই হিসেবে প্রতি কেজিতে তাঁর গড় উৎপাদন খরচ ১৬ টাকার বেশি।

সোনা মিয়া বলেন, গত বছর এক একর জমিতে খরচ হয়েছিল ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এবার বীজ ও জমি ইজারার খরচ কমায় দেড় লাখ হয়েছে। এক কেজি আলুতে খরচ ১৬ টাকার বেশি। কিন্তু বাজারে দাম উৎপাদন খরচের অর্ধেক। গত বছর দাম না পেয়ে গুদামে ছেড়ে এসেছেন। এবার কী হয় আল্লাহ ভালো জানেন।

আলুচাষিদের দাবি, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম চালু ও হিমাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো না হলে প্রতিবছরই তাঁদের এমন লোকসানের চক্রে পড়তে হবে।

সরকারপাড়া গ্রামের আলু চাষি সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এত কষ্ট করি আবাদ করিয়াও যদি দাম না পাই। বারবার যদি আমার মতো আলু চাষি লস খায় তাহলে বাঁচবে কেমন করে। আলুর আবাদ মনে হয় বাদ দিবার নাগবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় প্রথম আলোকে বলেন, বাজার পরিস্থিতি ও সংরক্ষণ সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। গত বছরের চেয়ে আলুর চাষ কম হলেও উৎপাদন ভালো হয়েছে।