বাবা–মা–ভাই যে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে, বোঝার বয়স হয়নি মহিমার

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে বাবা–মা ও ভাই যে মারা গেছে, এখনো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেনি ছোট্ট মহিমা মহিমা দত্ত। বৃহস্পতিবার সকালেছবি: প্রথম আলো

কখনো মন খারাপ করে বসে থাকছে শিশু মহিমা। আবার কখনো অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছে। এখনো সে ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেনি, তার বাবা–মা ও ভাই আর বেঁচে নেই। বাড়িতে সান্ত্বনা দিতে আসা অনেকের ভিড়ে মাঝেমধ্যে বাবা মারা যাওয়ার কথা বললেও এখনো তাদের অপেক্ষায় আছে শিশুটি।

মহিমা দত্ত (৭) ভারতের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মেয়ে। গত মঙ্গলবার রাতের ওই আগুনে মহিমার মা আফসানা শারমীন, ছোট ভাই তিন বছরের শর্ণশীষ দত্ত ও নানা আকরাম হোসেন মারা গেছেন। গতকাল বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

আরও পড়ুন

গতকাল বিকেলে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষের বাড়িতে গেলে স্বজনেরা বলেন, শোকের গভীরতা বোঝার বয়স হয়নি মহিমার। গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো তার কথা হয়েছিল। তখন বাবা বলেছিল, তার জন্য লেহেঙ্গা ও চকলেট কিনেছে। পরদিন (বুধবার) সকালে দেশে ফিরে সেগুলো তাকে দেবে।

মহিমা কুষ্টিয়া শহরের একটি স্কুলে কেজি শ্রেণিতে পড়ে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে তার স্কুল থেকে শিক্ষকেরা এসেছিলেন সমবেদনা জানাতে। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানে মহিমার উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনার সব খরচ বহন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে শর্ণশীষ দত্ত। ভারতে গিয়ে ৪ আগস্ট ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করেন দেবাশীষ দত্ত
ছবি : দেবাশীষ দত্তের ফেসবুক থেকে

আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দেবাশীষের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্তের বিলাপ থামছেই না। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দেবাশীষের সহকর্মী সাংবাদিকেরা তাঁর সামনে গেলে বারবার বলছেন, ‘আমার দেবা কই গো। তোমাদের সাথে নাই? কখন আসবে আমার দেবা। ওর জন্য পাবদা মাছ রান্না করে রাখিছি।’

কলকাতায় আছেন দেবাশীষের ভগ্নিপতির ভাই কাঞ্চন নন্দী। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি। কিছু কাগজপত্র আবার দিতে হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে থানায় আছি। দুপুরের পর হয়তো ময়নাতদন্ত হতে পারে।’

আরও পড়ুন
গত মঙ্গলবার রাতে কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ নয়জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশি সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক) মো. ওমর ফারুক আকন্দ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দেবাশীষের স্বজনেরা এসেছেন। পুলিশ এখনো লাশ হস্তান্তর করেনি। লাশ হস্তান্তরের পর তাদের (উপহাইকমিশন) দুই ঘণ্টার কিছু প্রক্রিয়া আছে। সেগুলো শেষ হলেই লাশ পাঠানো হবে। হয়তো বিকেল চারটা থেকে পাঁচটা বাজতে পারে। তবে পুলিশের লাশ হস্তান্তরের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে।

এদিকে দেবাশীষের বাবা–মাকে সান্ত্বনা দিতে গতকাল রাতে পৃথকভাবে তাঁদের বাড়িতে যান কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দীন। মহিমার পড়ালেখার বিষয়ে কী করা যায়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন সংসদ সদস্য। বিএনপি নেতা কুতুব উদ্দীনও শিশুটির ভবিষ্যৎ জীবনে খোঁজখবর রাখবেন বলে জানান।

সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের স্বজনদের আহাজারি। গতকাল বুধবার কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায়
ছবি: প্রথম আলো

গত মঙ্গলবার রাতে কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ নয়জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশি সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। কুষ্টিয়ার চারজন ছাড়া বাকি তিনজন হলেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার রেবতী সরকার ও আলিমুজ্জামান সাজু এবং ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের ব্যবসায়ী আহম্মেদ বাবু।

অসুস্থ স্ত্রী আফসানা শারমীনের চিকিৎসার জন্য ৩ আগস্ট ভারতে যান দেবাশীষ দত্ত। প্রথমে তাঁরা বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নেন। প্রায় ১৩ দিনের চিকিৎসা শেষে সোমবার রাতে কলকাতায় ফেরেন। মঙ্গলবার আত্মীয়স্বজনের জন্য কেনাকাটা শেষে বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

আরও পড়ুন