গত ২৫ অক্টোবর ভোরে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার নারাঙ্গাইয়ে একটি ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম (৪৫), তাঁর স্ত্রী সোনিয়া আক্তার (৩০) এবং তাঁদের আড়াই বছরের ছেলে রিফাত হোসেন অগ্নিগদ্ধ হন। পরে তাঁদের ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে স্বামী, সন্তান ও স্ত্রীর মৃত্যু হয়।

নিহত রাশেদুল ইসলামের বাড়ি সাটুরিয়া উপজেলার রাইল্যা গ্রামে। তিনি নারাঙ্গাই এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে মাংস বিক্রির ব্যবসা করতেন। মাংসের দোকানের কাছে নারাঙ্গাই এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে সন্তান নিয়ে তিনি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে থাকতেন।

ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ অক্টোবর রাতে ঝড়–বৃষ্টির কারণে রাশেদুল ফ্ল্যাটের দরজা ও জানালা বন্ধ করে রাখেন। ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে রাশেদুল ও তাঁর দোকানের কর্মচারী ফারুক এবং অপর কক্ষে সোনিয়া আক্তার ও রিফাত ঘুমিয়ে পড়েন। ভোর চারটার দিকে রাশেদুল সিগারেটে আগুন ধরানোর জন্য দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালানোর পরপরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় ফ্ল্যাটের একটি কক্ষের দেয়াল ধসে যায় এবং দরজা-জানালা ভেঙে আশপাশে পড়ে। এতে বাড়ির সবাই দগ্ধ হন।

এই দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ওই চারজনকে উদ্ধার করে জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সকালে রাশেদুল এবং তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

মানিকগঞ্জ সদর থানা-পুলিশ এবং পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৫ অক্টোবর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাশেদুল এবং গত সোমবার রাত ১০টার দিকে রিফাতের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ আজ বেলা ১১টার দিকে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোনিয়াও মারা যান।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রউফ সরকার বলেন, বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে স্বামী ও সন্তানের পর স্ত্রীও মারা যান।

নিহত রাশেদুলের মেজ ভাই আবুল কাশেম বলেন, ঘটনার তিন-চার দিন আগে তাঁর ছোট ভাই রাশেদুল ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। এর আগের ভাড়াটে চলে যাওয়ার সময় তিতাস গ্যাসের লাইন ভালোভাবে বন্ধ না করেই চুলা নিয়ে যান। পরে সেখানে তাঁর ভাইও তাঁদের গ্যাসের চুলা লাগান। প্রথমে গ্যাস সংকটের কারণে লাইনে গ্যাস না থাকায় সমস্যা হয়নি। তবে ঝড়–বৃষ্টির কারণে দরজা ও জানালা বন্ধ থাকায় এবং লাইনে গ্যাস আসায় পুরো কক্ষে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিষয়টি বুঝতে না পারায় দেশলাই দিয়ে আগুন জ্বালানোর পরপরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। তিনি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও ফ্ল্যাটের মালিকের গাফিলতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন।

ফ্ল্যাটের মালিক মাহতাব উদ্দিন অসুস্থ থাকায় তাঁর স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, ঘটনার দিন তিতাস গ্যাসের লাইনে প্রচুর গ্যাস আসছিল। সেই গ্যাস জমা হয়ে বিস্ফোরণ হয়। গ্যাসের লাইন এখন বন্ধ করা হয়েছে। তবে বিস্ফোরণের আগে লাইনের গ্যাসের সংযোগ বন্ধ ছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

এ ব্যাপারে আজ রাত সাড়ে আটটার দিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি মানিকগঞ্জ কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক আতিকুল ইসলামের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি একটি মিটিংয়ে আছি।’ পরে আবার তাঁর মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।