অদম্য মেধাবী ২০২৬: ৬
অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় স্বপ্ন
অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনের ষষ্ঠ পর্বে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।
অভাবের কারণে তাদের পড়াশোনার পথ সহজ ছিল না। কারও সংসারে খাবারের টান, কারও বাবার আয় বন্ধ, কারও পড়াশোনার খরচ আসে হাঁস বা গরু পালনের আয় থেকে। তবু সেই অভাবের মধ্যেই চার শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে।
কক্সবাজারের রিফাত, রাজবাড়ীর অথৈ, গাইবান্ধার ফেরদৌস ও ফরিদপুরের সিথীর সাফল্যের গল্প আলাদা। কিন্তু তাদের সবার সামনে এখন একই প্রশ্ন—পরের ধাপের পড়াশোনার খরচ আসবে কোথায় থেকে।
গরু পালন করেও সাফল্য রিফাতের
কখনো তিনবেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না, ছিল না প্রাইভেট বা কোচিংয়ের সুযোগ। স্কুল শেষে বিকেলে বন্ধুরা যখন মাঠে খেলতে যেত, মো. রিফাত তখন মাঠে যেত গরুর ঘাস কাটতে। সেখান থেকে এসে বসত পড়তে।
এভাবেই স্কুলজীবন কাটিয়ে রিফাত এবার কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং উচ্চবিদ্যালয় থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে উপজেলার কোয়াংছড়ি পাড়ার দিনমজুর মো. হাছানের ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মো. হাছান অন্যের জমি বর্গা নিয়ে শাকসবজির চাষ করে সংসার চালান। বর্ষায় জমিতে পানি ঢুকে কিংবা শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ত পানি ঢুকলে পুরো খেত নষ্ট হয়। তখন নাফ নদী কিংবা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে খাওয়া–পড়ার ব্যবস্থা করেন।
সংসারের অভাব মুছতে ১০ হাজার টাকায় একটি গাভি কিনেছিলেন হাছান। কয়েক বছরে সেই গাভি বাচ্চা দেয় চারটি। গরুর লালন-পালনের দায়িত্ব ছিল হাছানের চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় রিফাতের ওপর।
বাবা মো. হাছান বলেন, ‘খুব কষ্টে সংসার চালাই। বেশ কয়েকবার ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ছেলের কান্নাকাটি আর আগ্রহ দেখে তা হয়নি।’
মা রুজিনা আক্তার বলেন, এসএসসি পরীক্ষার সময়ও ছেলেকে ঠিকমতো খাওয়াতে পারেননি। পরীক্ষার হলে যাওয়ার গাড়িভাড়াও ছিল না। মুরগি বিক্রি করে যাতায়াতের খরচ দিয়েছিলেন। এত কষ্টের মধ্যেও ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাতে তাঁরা খুশি।
রিফাতের মেধা ও আগ্রহ দেখে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেতন মওকুফ করে দেয়। বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক তাকে বিনা পারিশ্রমিকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত পড়াতেন। বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক যিশু কান্তি দে বলেন, রিফাত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ছাত্র। নিজের দারিদ্র্যের কথা সে অন্যদের জানাতে চাইত না।
জিপিএ–৫ পেয়েও অথৈর দুশ্চিন্তা
বাবা ফেরিঘাটের শ্রমিক। মাঝেমধ্যে সেই কাজও থাকে না। মায়ের সামান্য আয় আর বাবার অনিশ্চিত রোজগারে চলে তাদের সংসার। এর মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে অথৈ আজাদ ওয়াজিহা। সে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ শহীদ স্মৃতি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
অথৈদের নিজেদের জায়গা নেই। প্রায় ১২ বছর আগে দৌলতদিয়া বাজার এলাকা থেকে গোয়ালন্দ কলেজপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন বাবা আবুল কালাম আজাদ। দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দিয়ে পারাপার হওয়া যাত্রীদের টিকিট চেক দেওয়ার বিনিময়ে সামান্য বেতন পেতেন। কয়েক মাস ধরে তাঁর সে কাজ বন্ধ রয়েছে। মা পলি বেগম দৌলতদিয়া ঘাট এলাকার একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। অথৈয়ের বড় বোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ছোট বোন নার্সারিতে পড়ে।
প্রতিদিন নিজে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পড়াশোনার পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়েছে অথৈ। প্রাইভেটের টাকা জোগাড় করতে নিজেও মাঝেমধ্যে প্রাইভেট পড়াত। অথৈ বলে, ‘মা–বাবা দুজনই অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। ঘাটশ্রমিক বাবার সামান্য আয়ের কথা চিন্তা করে আমরা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’ ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী হতে চায় অথৈ।
মা পলি বেগম বলেন, ‘আমাদের যত কষ্টই হোক, সন্তানেরা যাতে পড়াশোনা করে নিজেদের মতো করে সামনে এগোতে পারে, এ জন্য আমরা আরও কষ্ট করতে রাজি আছি।’
হাঁস পালন করে জিপিএ-৫ ফেরদৌসের
ভোরে নিজের পড়ালেখা সেরে নিয়েছে। এরপর হাঁসের যত্ন নেওয়া ও তাদের খাওয়ানো। হাঁসের পাল পুকুরে ছেড়ে দিয়ে আবার লেখাপড়া। এরপর বিদ্যালয়ে যাওয়া। বেশির ভাগ সময় সকালের নাশতা হয়নি। বিদ্যালয় থেকে ফিরেও পেটভরে নিজের খাবার জোটেনি। কিন্তু হাঁসের খাবার দিতে হয়েছে, সন্ধ্যায় হাঁস খোঁয়াড়ে তোলার পর আবার পড়াশোনা করেছে। কখনো হাঁস, কখনো ডিম বিক্রি করে খাতা–কলম–বই কিনেছে। এভাবেই লেখাপড়া চালিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে ফাহাদ আল ফেরদৌস।
ফেরদৌসের বাড়ি গাইবান্ধা সদরের লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে। তার বাবা খোরশেদ আলম ঝিনাইদহে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। সেই প্রতিষ্ঠানের বেতন দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। এখন তার আয়ের কোনো উৎস নেই। ফেরদৌসের মা ফেরদৌসী বেগম গৃহিণী। তাদের পাঁচ সদস্যের সংসার। তিন ভাইয়ের মধ্যে ফেরদৌস দ্বিতীয়। বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক চতুর্থ বর্ষে এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট ভাই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে।
লেখাপড়া করে চিকিৎসক হতে চায় ফাহাদ আল ফেরদৌস। সে বলে, ‘সংসারের অভাব ঘোচাতে চাই। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব হবে। কে আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নেবে।’
পড়ায় মনোযোগের ঘাটতি নেই সিথীর
সাদা গাউন পরে চিকিৎসকদের হাসপাতালে ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য দেখতে খুবই ভালো লাগে সিথী সাহার। ছোটবেলা থেকে তাই স্বপ্ন দেখে এসেছে, একদিন সে–ও চিকিৎসক হয়ে গায়ে সাদা গাউন পরে রোগীদের সেবা করবে। সে কারণে যখন ভালো লাগত, তখনই পড়ত—নির্দিষ্ট কোনো সময় ছিল না। পড়ার প্রতি মনোযোগের ঘাটতি কখনো হয়নি।
অভাবের সংসারে থেকেও নিজের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে চলেছে সিথী। এ বছর ফরিদপুর সদরের ডোমরাকান্দি উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
সিথী ফরিদপুর সদরের বদরপুর এলাকার বাসিন্দা মুদি ব্যবসায়ী হারানচন্দ্র সাহা ও গৃহিণী শিবানী সাহার মেয়ে। মা–বাবা দুজনও এখন স্বপ্ন দেখছেন মেয়ে চিকিৎসক হোক। তবে কলেজে পড়ার খরচ জোগাড় নিয়ে শুরু হয়েছে চিন্তা। হারানচন্দ্রের ভাষায়, ‘এটা বুঝি, এরপর ওই কলেজে ভর্তি হবে, তারপর যদি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে পারে, তাহলে অনেক খরচ বেড়ে যাবে। জানি না আমাদের অভাবের সংসারে এ ব্যয়ভার কীভাবে বহন করব।’
দুই ভাইবোনের মধ্যে সিথী ছোট। সে বলে, ‘ছোটবেলা থেকে আমি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে আসছি। এর কারণ মূলত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।’ ডোমরাকান্দি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোপাল চন্দ্র দত্ত বলেন, ‘সিথী অত্যন্ত মেধাবী। তবে পরিবারের একার পক্ষে মেয়েকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলার শক্তি নেই।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও কক্সবাজার, প্রতিনিধি, গাইবান্ধা ও রাজবাড়ী]