রাজশাহীতে বস্তাসংকটে পড়ে যাচ্ছে আলুর দাম

দামদর মিটিয়ে বস্তাসংকটের কথা বলে আর আলু নিতে আসেনি ব্যবসায়ী। সেই আলু গুছিয়ে রাখছেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান। বৃহস্পতিবার দুপুরে চোরখৈর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

রাজশাহীতে গত বছরের তুলনায় আলুর বস্তার দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। চরম আকার ধারণ করেছে বস্তাসংকট। এর প্রভাব পড়েছে আলুর দামে। বস্তার দাম বেশি হওয়ায় গত দুই দিনে কেজিতে আলুর দাম পড়ে গেছে ৩ টাকা। গত বুধবার যে আলু ১৬ টাকা বিক্রি হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সেই আলুর দাম ১৩ টাকায় নেমেছে। তবু ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। বস্তার অভাবে বাড়ির পাশে আলু স্তূপ করে রাখছেন চাষিরা।

চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর যে বস্তার দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। এবার সেই বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। গতকাল সেই বস্তার দাম উঠেছে ১৯৫ টাকা। এ নিয়ে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, হিমাগারমালিকেরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বস্তার দাম বাড়াচ্ছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রাজশাহীতে আলু চাষ হয়েছিল ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ হাজার হেক্টর; কিন্তু চাষ হয়েছে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের আলুচাষি আতাউর রহমান এবার পৌনে চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হয়েছে তাঁর। গত মঙ্গলবার এক ব্যবসায়ী ১৫ টাকা কেজি দাম বলে গেছেন। বুধবার তাঁর আলু নিতে আসার কথা ছিল। কিন্তু ওই ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বস্তাসংকটের কারণে আলু নিতে আসতে পারছেন না। এখন বাড়ির পাশে আলুর স্তূপ ঠিকঠাক করছেন আতাউর, যাতে বৃষ্টি এলে আলু নষ্ট না হয়ে যায়।

রাজশাহীর রহমান কোল্ডস্টোরেজের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হালিম বলেন, ‘এবার আলুর বস্তার মহাসংকট। গতবার যারা বস্তা বানিয়েছিল, সব বিক্রি হয় নাই। সেই আতঙ্কে এবার তারা বাড়তি বস্তা উৎপাদন করে নাই। যে কারণে এখন বস্তার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এবার আলু কেনার ক্রেতা বেশি। দাম কম তাই চাহিদা বেশি। কিন্তু ব্যাংকে টাকা থাকলেই আলু কেনা যায় না। আলু কেনার জন্য বস্তার প্রয়োজন। এখন একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, যাঁরা কেনাবেচা করছেন, তাঁরা হয়তো বলতে পারবেন।’

তানোরের আলুচাষি ও ব্যবসায়ী রানা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর ৭৫ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে বস্তা পাওয়া গেছে। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই ১২০ টাকা করে বস্তা কিনতে হয়েছে। ঈদের এক দিন পর ১৬০ টাকা করে বস্তা কিনেছেন। বস্তার অভাবে আলু কিনতে পারছেন না। এখন দাম উঠেছে ১৮০ টাকা।

তানোরের মুন্ডুমালা পৌর এলাকার বাসিন্দা আবদুল আউয়ালের এবার ৬০০ বস্তা আলু হয়েছে। তার মধ্যে ৩০০ বস্তা আলু ইতিমধ্যে তিনি হিমাগারে তুলে ফেলেছেন। বাকি ৩০০ বস্তা আলুর জন্য বস্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। গত বছর যে বস্তার দাম সর্বোচ্চ ৮০ টাকা ছিল, এবার সেই বস্তা ১৮০ টাকা হয়েছে। গতকাল সেই বস্তার দাম চাইছে ১৯৫ টাকা। শেষ পর্যন্ত তিনি বস্তা না কিনে ফিরে এসেছেন। তিনি বলেন, স্টোর মালিকেরা নিশ্চিত একটা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। যে কারণে আলুর দামও পড়ে গেছে। বুধবার যে আলু ১৬ টাকা ছিল, বৃহস্পতিবার সেই আলু ১৩ টাকাও নিতে চাচ্ছে না।

মুন্ডুমালা পৌর এলাকার চুনিয়াপাড়া মহল্লার কৃষক শামসুজ্জামান ১০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাঁর ৫০০ বস্তা চালু হয়েছে। তিনি বলেন, বুধবার ১৬ টাকা কেজি দরে আলুর দাম মিটিয়ে ব্যবসায়ী তাঁকে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম বায়না দিয়ে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সেই ব্যবসায়ী আলুর দাম ১৩ টাকার বেশি নিতে পারবেন না জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বলে গেছেন, অগ্রিম টাকাও ফেরত নেবেন না।

কোল্ডস্টোরেজ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, এবার পাটের দাম বেড়ে গেছে। গত বছর এক মণ পাট ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার সেই পাট ৫ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এ কারণে বস্তার দাম বাড়তে পারে। আর ছুটির কারণে কলকারখানা বন্ধ ছিল। তিনি আশা করছেন, সব কারখানা খুলে গেলে বস্তার সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, এ ধরনের সংকটের কথা কেউ তাঁদের জানাননি। আর জানলেও এ ব্যাপারে তাঁদের কিছুই করার নেই। তাঁরা বড়জোর কোথাও উপস্থাপন করতে পারেন।