ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে কৃষি ব্যাংকের সোহাগী বাজার শাখা থেকে টাকা লুটের চেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার কাওসার আহমেদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
জবানবন্দিতে আসামি জানিয়েছেন, ব্যাংক লুটের পরিকল্পনায় তাঁর সঙ্গে ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল ইসলামও ছিলেন। তাঁকে (মাজহারুল) বেঁধে ভল্টের তালা ভেঙে টাকা লুটের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাঁধতে গিয়ে অসাবধানতায় তাঁর (মাজহারুল) হাত কেটে গেলে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আছমা আক্তারের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন কাওসার। পরে আজ শনিবার সকালে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সোহাগী বাজার এলাকা থেকে নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি সোহাগী ইউনিয়নের বৈরাটি গ্রামের প্রয়াত আবুল কাশেমের ছেলে। প্রায় তিন বছর ধরে তিনি অস্থায়ী নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে ওই ব্যাংকে চাকরি করছিলেন।
জবানবন্দির বিষয়টি নিশ্চিত করে ময়মনসিংহ আদালত পুলিশের পরিদর্শক পি এস এম মোস্তাছিনুর রহমান শনিবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, একজন আসামি গতকাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে আরও দুজনের নাম এসেছে। তাঁদের মধ্যে ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষীও আছেন।
এর আগে গত বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে সোহাগী বাজারে কৃষি ব্যাংকের শাখায় টাকা লুটের চেষ্টা করেন কাওসার আহমেদ। পেশায় বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি কাওসার প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ পেতে ব্যাংকে গিয়েছিলেন। ঋণ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যাংক লুটের পরিকল্পনা করেছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছিল। এ ঘটনায় ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার থানায় একটি মামলা করেন।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাদ রোমন প্রথম আলোকে বলেন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসামি কাওসার জানিয়েছেন, ব্যাংক লুটের চেষ্টার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো ছিল। ব্যাংকে ঋণ নিতে গিয়ে কাওসারের সঙ্গে ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল ইসলামের পরিচয় হয়। এরপর বিভিন্ন সময় আড্ডা দিতে দিতে তাঁরা ব্যাংকে চুরির পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা ছিল—কাওসার ভল্টের টাকা লুট করবেন এবং নিরাপত্তারক্ষীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে চুরির নাটক সাজানো হবে, যাতে কারও সন্দেহ না হয়। পরে লুট করা টাকা দুজন সমানভাবে ভাগ করে নেবেন।
ওসি সাজ্জাদ রোমন বলেন, ব্যাংকে কোন দিক দিয়ে ঢুকতে হবে, তালা না কেটে শিকল কাটতে হবে, দরজার সিটকিনি হালকা লাগানো থাকবে—সবই নিরাপত্তাকর্মী ব্যবস্থা করে দেন কাওসারকে। ঘটনার দিন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাউসার ব্যাংকে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মী মাজহারুলকে বাঁধতে শুরু করেন। কিন্তু দড়ির বাঁধন অতিরিক্ত শক্ত হয়ে গেলে মাজহারুল কিছুটা ঢিল করে দিতে বলেন। তখন চাকু দিয়ে দড়ির গিঁট আলগা করতে গেলে দুর্ঘটনাবশত পোঁচ লেগে মাজহারুলের হাত সামান্য কেটে যায়। হঠাৎ রক্ত দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মাজহারুল। তাঁর ধারণা হয়, সুযোগ বুঝে কাওসার হয়তো তাঁকে মেরে ফেলতে পারে। সেই সন্দেহ থেকে তিনি পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন এবং সবকিছু ভেস্তে দিয়ে বাইরে গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন।
ওসি আরও বলেন, কোনো ধস্তাধস্তি ছাড়া একজন ব্যক্তি একা কীভাবে ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে ফেললেন—বিষয়টি শুরু থেকেই সন্দেহজনক ছিল। পরবর্তী সময়ে চাকুর সামান্য পোঁচ ও জবানবন্দি বিশ্লেষণ করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। আপাতত তাঁদের দুজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে নিরাপত্তারক্ষী মাজহারুল এ ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক। শনিবার বিকেলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপত্তারক্ষী চিৎকার করে লোকজন জড়ো করেন এবং কাওসারকে ধরতে সাহায্য করেন। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে কাওসার জবানবন্দিতে তাঁর নাম বলে থাকতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জানতে চাইলে ওসি সাজ্জাদ রোমন বলেন, গ্রেপ্তার নিরাপত্তারক্ষী জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে অসংগতি আছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের তথ্য যাচাই করতে মুঠোফোনের কল রেকর্ড সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।