আলাদা বাড়িতে দুই ছেলের সংসার, মায়ের ঠাঁই জরাজীর্ণ ঘরে

দুই ছেলে আলাদা পাকা বাড়িতে বসবাস করলেও বৃদ্ধা মা সালেহা বেগম থাকেন জরাজীর্ণ এই ঘরে। গত বুধবার ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পাতিবিলা গ্রামের উত্তর পাড়ায়ছবি: প্রথম আলো

আলাদা বাড়ি বানিয়েছেন দুই ছেলে। একতলা সেই বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তাঁরা বসবাস করেন। কিন্তু সেই দুই বাড়ির কোনোটিতে জায়গা হয়নি মা সালেহা বেগমের (৭৮)। তিনি স্বামীর রেখে যাওয়া পুরোনো জরাজীর্ণ ঘরে একাই থাকছেন।

কয়েক দিন আগেও সেখানে বিদ্যুতের আলো ছিল না। খাবার দেওয়া হয় অনিয়মিত। ছেলেরা খাবার না দিলে না খেয়ে থাকতে হয়। সালেহা বেগম বলেন, একা থাকতে খুব ভয় হয়; কিন্তু তাঁর যাওয়ার জায়গা নেই। ছেলেরা বাড়িতে নিলে ভালো হতো।

সালেহার বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পাতিবিলা গ্রামের উত্তর পাড়ায়। স্বামী মতলেব আলী মল্লিক হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে একটি মেয়ে মারা গেছে। অন্য মেয়েরা বিয়ে করে স্বামীর বাড়িতে আছেন। বড় ছেলে আহাদ আলী (৫০) ও ছোট ছেলে অমেদ আলী (৪৫) আলাদা বাড়িতে থাকেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একা হয়ে পড়েছেন।

গতকাল বুধবার সালেহার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরের সামনে পলিথিন দিয়ে ঘেরা চালার মধ্যে বসে আছেন সালেহা। পাশে একটি থালায় কিছু খাবার রাখা। সালেহা জানালেন, রাতে দেওয়া খাবার সকালে খাওয়ার জন্য রেখেছেন। অনুরোধ করেন, ‘ছেলেদের বুঝিয়ে তাদের বাড়িতে আমাকে তুলে দিতে পারো? আমি আর একা থাকতে পারছি না।’

সালেহার ভাষ্য, দুই ছেলে কৃষিকাজের পাশাপাশি বিদেশে গিয়ে টাকা আয় করে এখন সচ্ছল হয়ে সংসার ভাগ করে ফেলেছেন। বাবার রেখে যাওয়া জমিতে তাঁরা বাড়ি করেছেন। তাঁদের বাবা মাঠে ৭ থেকে ৮ বিঘা জমি রেখে গেছেন, যা ছেলেরা ভোগ করছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেরা নতুন বাড়ি করলে সেই বাড়িতে তাঁর জায়গা হবে বলে আশা করেছিলেন তিনি; কিন্তু ছেলেরা তাঁকে বাড়িতে তোলেননি। বাধ্য হয়ে তাঁকে স্বামীর রেখে যাওয়া জরাজীর্ণ ঘরে একা থাকতে হচ্ছে।

বৃদ্ধা সালেহা বেগম
ছবি: প্রথম আলো

ছেলের বউরা খাবার দিয়ে গেলে খান বলে জানালেন সালেহা বেগম। মাঝেমধ্যে তাঁরা গোসল করিয়ে যান। দুই বছর আগে ভ্যান থেকে পড়ে তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। এরপর ছেলেদের বাড়িতে থাকার কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাঁরা নেননি।

প্রতিবেশী আতিয়ার রহমান মল্লিক বলেন, সালেহা বেগম তাঁর বড় ভাবি। ছেলেরা তাঁকে বাড়িতে আশ্রয় দিতে চান না। পাড়ায় একদিন সবাই বসে বাড়িতে নেওয়ার জন্য দুই ভাইকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই ভাই-ই এটা তাঁদের পক্ষে সম্ভব না বলে জানিয়ে দেন।

অভিযোগের বিষয় আহাদ আলী ও অমেদ আলীর মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তাঁরা ধরেননি। এ বিষয়ে কথা বলতে তাঁদের বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যায়নি।

তবে আহাদ আলীর স্ত্রী চায়না বেগম বলেন, শাশুড়িকে তাঁরা সব ধরনের সেবা করছেন। সময়মতো খাবার দেন। গোসল করান, কাপড় পরিষ্কার করে দেন। বাড়িতে একটু সমস্যা থাকায় পুরোনো বাড়িতেই রেখেছেন। একা থাকার বিষয়ে বলেন, পাশেই অন্য বাড়িঘর আছে। ফলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বাড়িতে নিয়ে রাখতে তাঁর আপত্তি নেই। তবে সেটা দুই ছেলেকে সমানভাবে করতে হবে।

পিতা-মাতার ভরণপোষণের একটি আইন আছে জানিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ওই বৃদ্ধার পক্ষ থেকে কেউ অভিযোগ করলে তাঁরা পদক্ষেপ নেবেন।