দুপুরের রান্না শেষ করতে বিকেল, চট্টগ্রামে গ্যাস–সংকট কমছে না

মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর চট্টগ্রামে গ্যাস-সংকট তীব্র হয়েছে। চাহিদার তুলনায় মাত্র ৬৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় আবাসিক ও শিল্পকারখানায় চাপ কমানো হয়েছে। অনেক এলাকায় দুপুর বা বিকেল পর্যন্ত রান্না করা যাচ্ছে না। টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা আছে, কিন্তু গ্যাস নেই। তাই মাটির চুলায় রান্না করছেন এই নারীছবি: সৌরভ দাশ

সকাল ১০টার পরই নিভে যায় গ্যাসের চুলা। শুরু হয় অপেক্ষা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বেলা তিনটার দিকে গ্যাস ফিরলেও চাপ থাকে কম। পানি ফুটাতেই লেগে যায় দীর্ঘ সময়। রান্না শেষ হতে হতে বিকেল। এভাবেই গত এক সপ্তাহ কাটছে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকার বাসিন্দা শিরিন আক্তারের। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘সকালে রান্না শেষ করতে না পারলে পুরো দিন এলোমেলো হয়ে যায়। কখন গ্যাস থাকবে, কখন থাকবে না—কোনো ঠিক নেই। গ্যাস এলেও চাপ থাকে না। পানি সেদ্ধ করতেও অনেক সময় লাগে।’

শিরিন আক্তারের মতো ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরের আরও অনেক বাসিন্দা। কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে আগুন লাগার পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও সেটি এখনো চালু হয়নি। ফলে চট্টগ্রামে গ্যাস-সংকট আরও বেড়েছে। সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে শিল্প, শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা (ক্যাপটিভ পাওয়ার) এবং আবাসিক খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। এতে দুর্ভোগ বাড়ছে।

কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ একই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের বিপরীতে মিলেছে মাত্র ৬৬ শতাংশ গ্যাস। ঘাটতি ছিল প্রায় ১২ কোটি ঘনফুট।

কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দিনে দিনে গ্যাস-সংকট বাড়ছে। নগরের প্রায় সব এলাকাতেই চাপ কম। শিল্পেও চাপ কমাতে হয়েছে। টার্মিনাল চালু না হলে সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। তখন ভোগান্তিও বাড়বে।

একই সংকট বারবার

চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করে কক্সবাজারের মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি। অন্যটি পরিচালনা করে সামিট এলএনজি টার্মিনাল। দুটি টার্মিনাল থেকেই জাতীয় গ্রিড হয়ে চট্টগ্রামে গ্যাস আসে।

জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই দুই টার্মিনালের যেকোনো একটিতে কারিগরি ত্রুটি, দুর্ঘটনা বা বৈরী আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামে। এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়। প্রায় প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড়, বৈরী আবহাওয়া বা কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। প্রতিবারই ভোগান্তিতে পড়েন শিল্পকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকেরা। এবারও সার, বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেই সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামেও। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি।

তবে বারবার একই পরিস্থিতি তৈরি হলেও গ্রাহকদের জন্য আগাম সতর্কতার কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। বর্তমান সংকটেও কেজিডিসিএলের ওয়েবসাইটে গ্যাস-সংকট নিয়ে কোনো বিজ্ঞপ্তি নেই। কোন এলাকায় কখন গ্যাসের চাপ কম থাকবে, কত দিন সংকট চলতে পারে কিংবা গ্রাহকদের কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত—এসব বিষয়েও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে গ্যাস চলে যাওয়ার পরই বিষয়টি জানতে পারছেন গ্রাহকেরা।

নগরের আগ্রাবাদ, হালিশহর, বহদ্দারহাট, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আগে থেকেই গ্যাসের চাপ কম ছিল। টার্মিনালে আগুন লাগার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অনেক এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চুলা জ্বলে না। কোথাও আবার বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

টার্মিনাল চালু নিয়ে অনিশ্চয়তা

মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেই সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামেও। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে  ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি।

তবে তার আগেই টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালুর চেষ্টা চলছে। সেটি চালু করা গেলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে বর্তমান সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ একই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের বিপরীতে মিলেছে মাত্র ৬৬ শতাংশ গ্যাস। ঘাটতি ছিল প্রায় ১২ কোটি ঘনফুট।

তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে এনে ইতিমধ্যে টার্মিনালে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিদেশি কারিগরি দলের সঙ্গে দেশীয় একটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরাও কাজ করছেন। অক্ষত বয়লার থেকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ চালু করতে জোর তৎপরতা চলছে। তবে সেটি কবে চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি তাঁরা।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিশেষজ্ঞ দল টার্মিনাল চালুর কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অক্ষত বয়লার চালুর চেষ্টা চলছে। বর্তমানে অপর টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস-সংকট পুরোপুরি কাটবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।