জামায়াত আমিরের বক্তব্যে ‘বিস্মিত’ চসিক মেয়র, বললেন ‘ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করে গেছেন’

ফেসবুকে লাইভে এসে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেনছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেছেন, মেয়র হিসেবে তাঁর মেয়াদ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্যে তিনি ‘বিস্মিত’। তিনি বলেন, ‘এই বক্তব্যের মাধ্যমে জামায়াতের আমির স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আমলের ফ্যাসিস্ট মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে বৈধ মেয়র হিসেবে সম্মতি দিয়েছেন এবং এ বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করে গেছেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় মেয়র শাহাদাত হোসেন এসব মন্তব্য করেন। মেয়র বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। ভিডিওতে শাহাদাত হোসেন বলেন, আদালতের রায় অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত।

গতকাল শনিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ হয়। সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন।

সমাবেশে চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশন প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আগের যে সরকার, যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এই সরকার একই রাস্তা ধরে হাঁটছে। চট্টগ্রাম তার আরেকটা বাস্তব উদাহরণ। এখানে একজন মেয়র আছেন। এখন শুনি যে উনি যত দিন ইচ্ছা তত দিন থাকবেন। এটা কি সুশাসন নাকি ফ্যাসিবাদ? আপনি আসেন, আবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। আপনি নেতৃত্ব দেন। আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্যের পর শনিবার রাতে ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। ওই ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট কায়দায় ২০২১ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত করেছিল। রেজাউল করিম চৌধুরী অবৈধভাবে মেয়র হয়েছিলেন। ওই দিন জোর করে জনগণের রায় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিলাম। ট্রাইব্যুনাল আমাকে মেয়র নির্বাচিত ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরে আমি ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছিলাম।’

আদালতের রায় অনুযায়ী মেয়র হিসেবে তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বলে ভিডিও বার্তায় মন্তব্য করেন বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এটি ঐতিহাসিক রায়। এ রায়ের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আর জামায়াতের আমিরের কথার মধ্যে দিয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, তিনি আওয়ামী লীগের যে পাঁচ বছর ফ্যাসিবাদী সময়, সেটিকে বৈধ বলছেন। কিন্তু রায়ে স্পষ্টভাবে বলা আছে, আওয়ামী লীগের যিনি মেয়র ছিলেন তিনি অবৈধ ও মেয়াদও অবৈধ। আর মেয়র হিসেবে আমার (শাহাদাত হোসেন) মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকবে।’

চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, জনগণের প্রত্যাশিত রায় পাওয়ার জন্য তিন বছর ধরে তিনি লড়াই করেছেন। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ছয় মাস ধরে জেলে থাকতে হয়। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ১১০টি মামলা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করা হলে পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলে জানান মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে স্বাগত জানাব। এ নিয়ে ভুল–বোঝাবুঝির কিছু নেই। এ কথা আগেও বলেছি। সবারই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার আছে। সবাই মিলে গণতান্ত্রিক নির্বাচন করতে চান। অতীতে বিএনপির আমলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। এবারও রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশ্বাসযোগ্য, গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।’ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের লংমার্চকে ‘লং ড্রাইভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন মেয়র শাহাদাত হোসেন।

চট্টগ্রামের লালদিঘির ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চ সমাপনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। গতকাল রাতে
ছবি: জুয়েল শীল

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি। ওই নির্বাচনে মেয়র পদে জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। ৪১টি সাধারণ ও ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সব কটিতে জয় পান দলটির সমর্থকেরা। এই পরিষদের প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামসহ ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ে মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল এবং মামলার বাদী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করা হয়। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেয়র হিসেবে শপথ নেন শাহাদাত হোসেন।