দেশের মৎস্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনের হার মূলত বেড়েছে ইলিশের কারণে। গত এক দশকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে জাতীয় মাছটির উৎপাদন এখন প্রায় ৬ লাখ টনে পৌঁছেছে। ইলিশে এ দেশ বিশ্বে ১ নম্বর। মোট ইলিশের ৮০ শতাংশই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। একই সঙ্গে দেশের বিজ্ঞানীদের চাষোপযোগী দেশি মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবন পুকুরে মাছ চাষে নীরব বিপ্লব এনেছে।

এফএও বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিশ্বে লোনাপানির মাছসহ সব ধরনের মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১৪ শতাংশ। চাষের মাছের ক্ষেত্রে এটা বেড়েছে ৫২৭ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে মানুষের মাছ খাওয়া বেড়েছে ১২২ শতাংশ।

default-image

তবে মৎস্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ উৎপাদনে বিশ্বের অনন্য দৃষ্টান্ত যেমন আছে, তেমনি এ নিয়ে আশঙ্কার বিষয়ও আছে। তাঁরা বলছেন, বিশ্বে মাছের উৎপাদন যেমন বাড়ছে, তেমনি মোট মাছের মজুতও কমে যাচ্ছে। দুই বছর আগে এফএওর এক প্রতিবেদনেই এমন তথ্য উঠে এসেছিল বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। এফএও উল্লেখ করেছিল, বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় পর্যাপ্ত মাছ নেই। যেমন ১৯৯০ সালে মজুত ছিল ৯০ শতাংশ। ২০১৮ সালে সেটা কমে ৬৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন নেতৃত্বের ভূমিকায়। গত কয়েক দশকে চাষ করা মাছ এবং এক দশকে প্রাকৃতিক উৎসের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি অনুকরণীয়। কিন্তু নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ, হাওর-বাঁওড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোর সংকোচন, দখল, অপোন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ার মতো ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে মাছ ধরা এবং চাষের সঙ্গে জড়িত বিপুল পেশাজীবীদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত। যা এই অগ্রগতিকে হুমকিতে ফেলতে পারে। দেশে এখন প্রায় চার কোটি লোক মৎস্য খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশের জাতীয় আয়ে মৎস্য খাতের অবদান এখন ৪ শতাংশ। এর মধ্যে ইলিশই ১ শতাংশের জোগান দেয়। অভ্যন্তরীণ উৎসের ১২ লাখ মেট্রিক টন মৎস্য উৎপাদন করে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ছয় লাখ টনই ইলিশ।

দেশের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্য ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ প্রকল্পের। ইকোফিশ-২ প্রকল্পের দলনেতা অধ্যাপক আবদুল ওহাব প্রথম আলোকে বলেন, মৎস্য খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বের অনুপ্রেরণা এখন। ভালো ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্যবিজ্ঞানী, মৎস্য অধিদপ্তর ও জেলেদের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগে এটা সম্ভব হয়েছে। এখন এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে নতুন নতুন খাত বের করতে হবে। কেননা, আমাদের বিশাল সমুদ্রভান্ডার এখনো অনুন্মোচিত। নদ-নদীতে এখন ইলিশের পাশাপাশি ক্যাটফিশ গোত্রের মাছের মজুত বেড়েছে অনেক। এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। সমুদ্রের মৎস্যভান্ডারকে কাজে লাগাতে উদ্যোগ নিতে হবে। হাওর-বাঁওড়, অন্যান্য জলাশয় ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন, দূষণরোধ এবং জাতীয় আয়ে মৎস্য খাতের বিপুল অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তবেই এই অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব।

default-image

মহাসাগরগুলোতে কমে যাচ্ছে অক্সিজেন

মৎস্য খাতের সবচেয়ে বড় হুমকি এখন নদী ও সাগরদূষণ। জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে মহাসাগরগুলোতে অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, যে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাছের অসংখ্য প্রজাতি। হুমকিতে পড়তে পারে মৎস্যভান্ডার। ২০১৯ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের বৃহৎ পরিসরের একটি গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু দশক ধরেই বিজ্ঞানীরা জানতেন যে মহাসাগরগুলোতে পুষ্টিমান কমে যাচ্ছে। এখন গবেষকেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অক্সিজেন হ্রাস পরিস্থিতিকে মারাত্মক করে তুলছে। বিশ্বজুড়ে সাত শতাধিক সামুদ্রিক এলাকা এখন অক্সিজেন স্বল্পতায় ভুগছে। ১৯৬০-এর দশকে অক্সিজেন–স্বল্পতায় ভোগা সামুদ্রিক এলাকার সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৫। কৃষি খামার ও শিল্পকারখানা থেকে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস সমুদ্রের পানিতে গিয়ে মেশার কারণেই পুষ্টিদূষণের ঘটনা ঘটছে।

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের এক নিবন্ধ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের মে মাসে বিজ্ঞানীদের একটি বহুজাতিক দল একটি উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছে। তা হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে খুব বড় একটি অক্সিজেনশূন্য এলাকার সন্ধান পেয়েছেন তাঁরা। অঞ্চলটি ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এই ‘ডেড জোন’ হবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেড জোন। এখানে অক্সিজেন কমে গিয়ে সালফার ও ফসফরাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কিছু কিছু ফাইটোপাঙ্কটন ও জুপ্লাঙ্কটন এই পরিবেশে হয়তো বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু ধীরে ধীরে অক্সিজেনের মাত্রা আরও কমে গেলে পানিতে নাইট্রোজেনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে খাদ্যশৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্যের দূষণ বা বর্ষার পরিবর্তন, উষ্ণায়নসহ নানা কারণে এই ডেড জোনের সৃষ্টি হতে পারে।

সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ উপকূলে সাগরের বড় মাছ ও প্রাণীগুলো মোহনায় চলে আসার ঘটনা ঘটছে অহরহ। এসব গভীর জলের প্রাণী মোহনায় এসে দেদার মারা পড়ছে। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা করতে না পারলে দেশের মৎস্যসম্পদের সম্প্রসারণ, সুরক্ষা, বৃদ্ধি থমকে যেতে পারে, এমন মত দিয়েছেন দেশের গবেষকেরা।

default-image

প্লাস্টিকদূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাগরে জেলেদের ব্যবহার অনুপযোগী জাল ফেলে দেওয়া, শহরগুলোর প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-খালে মিশে সাগরে যাওয়া, এগুলো এখন ভয়ংকর দূষণের কারণ। মৎস্য খাতে আমাদের অগ্রগতি এই দূষণ রোধ না হলে থমকে যেতে পারে।’

এসব রোধে কিছু সুপারিশও আছে গবেষক মীর মোহাম্মদ আলীর। তিনি বলেন, জেলেরা যাতে অব্যবহৃত জাল সাগরে ফেলে না দেন, সে জন্য পুরোনো জালের বিনিময়ে নতুন জাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আবার প্লাস্টিকের বোতল, যেমন কোমল পানীয়ের ক্ষেত্রে পানির মূল্যের সঙ্গে বোতলের মূল্য ধার্য করে দিয়ে পরে খালি বোতল জমা দিয়ে বর্ধিত অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটা করতে পারলে বড় সুফল মিলতে পারে।

নদীদূষণের ভয়াবহতা দেশের মৎস্যসম্পদের অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় হুমকি হয়ে উঠছে ক্রমে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির মতে, প্রতিদিন প্রায় ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। পরিমাণের দিক থেকে এটি বিশ্বে পঞ্চম।

মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকার মাছ ও প্রাণীদের চলাচল, শ্বাসপ্রশ্বাস ও খাদ্য গ্রহণপ্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে প্লাস্টিক। ভাসমান প্লাস্টিক সামগ্রী সমুদ্রে সূর্যালোক প্রতিহত করে। ফলে সমুদ্রে অক্সিজেন প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। এ কারণে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রাণির বিচরণ, প্রজনন ও খাদ্য গ্রহণপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে জীববৈচিত্র্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। যা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন