কুমিল্লায় হিজড়া মাহিকে পুড়িয়ে হত্যার নেপথ্যে মাদক, আরেক হিজড়া গ্রেপ্তার: র্যাব
মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও মাদকের টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে কুমিল্লার বুড়িচংয়ে হিজড়া এনামুল হক শিশির ওরফে মাহিকে (৩৫) হাত-পা বেঁধে শরীরে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে র্যাব। এ ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলাম ওরফে জহির (৪৬) নামে আরেক হিজড়াকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি।
গতকাল সোমবার দিবাগত রাতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা সীমান্ত থেকে জহিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। জহির অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে র্যাব-১১ সিপিসি-২ কুমিল্লা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মিঠুন কুমার কুণ্ডু এ তথ্য জানান।
নিহত মাহি বুড়িচং উপজেলার পূর্ণমতি গ্রামের কামরুল হকের সন্তান। তবে তাঁর পরিবার কুমিল্লা নগরের ছোটরা এলাকায় থাকে। প্রায় ১০ বছর আগে থেকে মাহি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। ১৩ মে বুড়িচং বাজারের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স-সংলগ্ন এলাকায় নৃশংস হামলার শিকার হন মাহি। রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৭ মে বিকেলে তিনি মারা যান। তাঁর শরীরের ৪৪ শতাংশ ও শ্বাসনালি পুড়ে গিয়েছিল।
ঘটনার শুরুতে হিজড়া হওয়ায় স্থানীয় কেউ কিংবা তাঁর সঙ্গীরা থানায় অভিযোগ করেননি। পুলিশ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তদন্তে নামে। পরে পুলিশ মাহির পরিবারের সন্ধান পায়। গত রোববার বিকেলে পরিবারটিকে থানায় ডেকে আনার পর মাহি ঢাকায় মারা যান। ওই দিন মাহির বাবা কামরুল হক বাদী হয়ে বুড়িচং থানায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ছয় থেকে সাতজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে একজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও মূল আসামি জহির পলাতক ছিলেন। জহির বুড়িচং উপজেলার রামপাল গ্রামের প্রয়াত জাফর আলীর সন্তান।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা মিঠুন কুমার কুণ্ডু বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার এড়াতে আসামিরা দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যায়। ঘটনার পরপরই ছায়া তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে র্যাবের একটি দল। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল রাত ১১টা ২০ মিনিটে র্যাব-১১ ও ৬-এর একটি যৌথ বিশেষ আভিযানিক দল সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্ত এলাকা থেকে প্রধান আসামি জহিরকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জহির এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
র্যাবের ভাষ্য, নিহত মাহি, গ্রেপ্তার জহিরসহ আসামিরা সবাই হিজড়া। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বুড়িচং বাজারের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স-সংলগ্ন সরকারি টিনশেড ভবনে বসবাস করে আসছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মাদকের টাকার ভাগাভাগি ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাহি ও জহিরের দলের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর আগে মাহি মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগও করেন।
র্যাবের ভাষ্য, মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে ১৩ মে সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে জহির ও তাঁর সহযোগীরা মাহিকে তাঁদের থাকার ঘরে হাত-পা বেঁধে ফেলেন। এরপর তাঁর শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মাহির চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নিভিয়ে তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ও পরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। ১৭ মে বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
র্যাব কর্মকর্তা মিঠুন কুমার কুণ্ডু বলেন, জহির নিজেই মাহির শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন দেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। পুরো হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাদক। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে র্যাব ও পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আসামি জহিরকে বুড়িচং থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।