এক বেলা খাবারের আশায় প্রতিদিন তাঁদের অপেক্ষা
দুপুর গড়াতেই শেরপুর শহরের দারোগালী পার্কের ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন গাছতলায় ভিড় জমে। কেউ বৃদ্ধ, কেউ দিনমজুর, কেউ পথশিশু, আবার কেউবা ভাসমান মানুষ। এক বেলা খাবারের আশায় প্রতিদিন সেখানে অপেক্ষা করেন ৭০ থেকে ৮০ জন নারী-পুরুষ। বেলা একটা থেকে দেড়টার মধ্যেই তাঁরা এসে সারিবদ্ধভাবে বসেন। তারপর অপেক্ষা একটি ভ্যানের জন্য।
ঘড়ির কাঁটা বেলা দুইটা ছুঁতেই ভ্যানটি এসে থামে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় খাবার পরিবেশন। গরম ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি আর ডিম বা মাছ-মাংস। রান্না করা খাবার একে একে তুলে দেওয়া হয় অপেক্ষমাণ মানুষের হাতে।
দুজন স্বেচ্ছাসেবক পুরো কার্যক্রম তদারক করেন। পেট ভরে খাওয়া শেষে সবাই নিজের থালা ধুয়ে নির্ধারিত স্থানে রেখে নীরবে চলে যান। এভাবেই প্রতিদিন শেষ হয় শেরপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নৃ ফাউন্ডেশনের ‘অনাহারীর আহার’ কর্মসূচির আরেকটি দিন।
ঝড়বৃষ্টিতেও থামেনি আয়োজন
শুধু খাবার বিতরণ নয়, উপকারভোগীদের জন্য ঈদগাহ মাঠের পাশেই একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও করেছে সংগঠনটি। সেখানে সহজেই নিরাপদ পানি পান করতে পারেন তাঁরা।
ঝড়বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়া—কোনো কিছুই থামাতে পারেনি এই উদ্যোগ। বছরের ৩৬৫ দিনই চলে ‘অনাহারীর আহার’ কর্মসূচি। প্রতিদিনের তালিকায় থাকা খাবারের বাইরে মৌসুমভেদে দেওয়া হয় বিভিন্ন ধরনের ফলও।
রমজান মাসে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। আবার কারও মা–বাবার মৃত্যুবার্ষিকী, সন্তানের জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে অনেকেই নৃ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিশেষ খাবারের আয়োজন করেন।
করোনাকালে শুরু
এই মানবিক উদ্যোগের শুরু ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়। লকডাউনে কর্মহীন মানুষের দুর্দশা দেখে মো. মাশরেকুল হক, মাজহারুল হক, রাজিব আহমেদসহ ১৫ থেকে ২০ জন যুবক নিজেদের অর্থায়নে রান্না করা খাবার বিতরণ শুরু করেন। ওই বছরের ৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে নৃ ফাউন্ডেশন। সেই থেকে টানা ছয় বছর ধরে প্রতিদিন মানুষের জন্য এক বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে সংগঠনটি।
বর্তমানে শেরপুর শহরের মাধবপুর এলাকায় সংগঠনটির একটি অস্থায়ী কার্যালয় রয়েছে। ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের শুভানুধ্যায়ীরাও যুক্ত হচ্ছেন এ উদ্যোগে। ২১ সদস্যের একটি কমিটি সংগঠনটি পরিচালনা করছে। এর মধ্যে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ সাত সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি রয়েছে।
কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল হক বলেন, ‘কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে—এই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের যাত্রা। মানুষের সহযোগিতায় ছয় বছর ধরে প্রতিদিন এক বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরেছি।’ এখন শুধু খাবার বিতরণেই সীমাবদ্ধ নেই তাঁদের কার্যক্রম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আত্মকর্মসংস্থান নিয়েও তাঁরা কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
যে কেউ চাইলে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একজন মানুষের মুখে এক বেলার খাবার তুলে দিতে পারেন বলে জানান সংগঠনের সদস্য রাজিব আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই দান নয়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে।’
দুপুরের খাবারের ভরসা
শহরের ৭০ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের মতো খাবার খেতে এসেছিলেন সেখানে। তিনি বলেন, কাজ করার মতো তাঁর শরীরে আর শক্তি নেই। প্রতিদিন এখানে এসে পেট ভরে খেতে পারেন। ঝড়বৃষ্টি হলেও আয়োজকেরা খাবারের ব্যবস্থা করেন। এই খাবার না পেলে তাঁর মতো অসহায় অনেক মানুষকে না খেয়ে থাকতে হতো বলেও মনে করেন তিনি।
ভাসমান নারী আঞ্জুয়ারা বেগম হোটেলে ধোয়ামোছার কাজ করেন। দুপুর হলেই এক বেলা খাবারের জন্য চলে আসেন এখানে। আঞ্জুয়ারা বলেন, ‘এখানে কেউ ছোট-বড় দেখে না। সম্মানের সঙ্গে বসিয়ে খাওয়ানো হয়। ভালো মানুষের মতো ব্যবহার করে। আমাদের মতো অসহায় মানুষের দুপুরের খাবারের ভরসা এই সংগঠন।’
নৃ ফাউন্ডেশনের কর্মীদের বিশ্বাস, একজন মানুষের ক্ষুধা নিবারণ শুধু খাবার তুলে দেওয়া নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর সম্মান ও মানবিক মর্যাদাও। সেই বিশ্বাস নিয়েই ছয় বছর ধরে প্রতিদিন বেলা দুইটায় শেরপুরে সাজানো হয় ‘অনাহারীর আহার’।