খুলনায় বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি, কোম্পানি ও ডিলারদের কারসাজি বলছেন খুচরা বিক্রেতারা
খুলনায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হওয়ায় চাপে পড়েছেন ভোক্তারা। বিক্রেতাদের অভিযোগ, গ্যাস বিক্রি মূলত কয়েকটি বড় কোম্পানি ও ডিলারের নিয়ন্ত্রণে। তাদের নির্ধারিত দামের ওপরই বাজার পরিচালিত হচ্ছে।
দেশে ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম গতকাল বৃহস্পতিবার ৩৮৭ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা, যা গত মার্চে ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা।
ক্রেতাদের দাবি, মূল্যবৃদ্ধির আগেই খুলনার বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা–ও ছিল সরবরাহ–সংকটের মধ্যে।
আজ শুক্রবার নগরের গল্লামারী, নাজিরঘাট, নিরালা, কমার্স কলেজ এলাকা, খালিশপুর, আলমনগর ও বয়রা এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, এখন সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে অধিকাংশ দোকানেই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।
এসব এলাকা ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১ এপ্রিল বেশির ভাগ গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানির সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। যেসব কোম্পানির সিলিন্ডার পাওয়া গেছে, সেগুলোও বেশি দামে কিনতে হয়েছে। দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও খুচরা বাজারে উচ্চমূল্য কমেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার এক বিক্রেতা বলেন, মার্চের শেষ দিক থেকেই কোম্পানির ডিলাররা সরবরাহ সংকটের কথা বলছিলেন। এখন দাম বাড়ার পর সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হয়েছে। তাঁর দাবি, ডিলাররা আগেই সিলিন্ডার মজুত করে রেখেছিলেন।
গত মাসে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিনেছিলেন খুলনার বাগমারা এলাকার বাসিন্দা হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, আজ তাঁকে ২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হয়েছে। তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারে দেড় মাসে দুটি সিলিন্ডার লাগে। এতে মাসিক গ্যাস খরচ দুই হাজার টাকার বেশি হয়ে গেছে, যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
সরকার নির্ধারিত দামের বিষয়ে হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সরকারি দাম শুধু কাগজে-কলমে। কমলেও বাজারে তার প্রভাব পড়ে না, কিন্তু বাড়লে ভোক্তাদের ওপরই চাপ পড়ে।’
নগরের এসওএস শিশুপল্লীর বিপরীতে একটি দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। দোকানটির স্বত্বাধিকারী সৈয়দ শওকত আলী বলেন, তাঁকে প্রতিটি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৮৭০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ হওয়ায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
নাজিরঘাট এলাকার নিউ খুলনা স্টোরের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল রহমান বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির গ্যাস ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তাঁরা খুচরা বিক্রেতারা অল্প লাভে বিক্রি করছেন। তাঁর অভিযোগ, কয়েক দিন ডিপো থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
আশরাফুল রহমান আরও বলেন, ‘সরকার দাম নির্ধারণ করলেও আমরা সেই দামে গ্যাস কিনতে পারি না। ডিলাররা দাম ঠিক করে। মেমো চাইলে গ্যাস দেওয়া বন্ধ করে দেয়।’
নগরের নিরালা এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, শ্রমিক খরচসহ প্রতি সিলিন্ডার প্রায় ১ হাজার ৯০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা লাভ না করলে ব্যবসা চালানো কঠিন। তাঁর ভাষ্য, প্রকৃত লাভ কোম্পানি বা ডিলারদের হাতেই যায়।
সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজার ও যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে দাম বাড়িয়ে দেয় বলে জানান খুলনা এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শেখ তোবারেক হোসেন। তাঁর ভাষ্য, এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঝুঁকিতে পড়ছেন। দাম বাড়ার আগে বিভিন্ন পরিবেশকের কাছে বিপুল পরিমাণ সিলিন্ডার মজুত ছিল, যা এখন বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক অনুমোদনহীন দোকানেও বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে।