স্কুলের খাতা ছেড়ে জীবনের স্টিয়ারিং হাতে সাজিদ
সাজিদ হোসেনের বয়স মাত্র ১৩ বছর। এই বয়সে তার থাকার কথা ছিল স্কুলের মাঠে; হাতে খাতা-কলম, কাঁধে ব্যাগ, বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে বেড়ানোর। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন টানে তাকে এখন বসতে হয় অটোরিকশার হাতল ধরে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ব্যস্ত সড়কেই কেটে যায় তার প্রতিদিন।
আজ শুক্রবার আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে যখন নানা আয়োজন চলছে, তখন দেশের নানা প্রান্তে অসংখ্য শিশু জড়িয়ে আছে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে। সাজিদের জীবন সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি। উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের এই কিশোর চার বছর বয়সেই হারায় মাকে। কিছুদিন পর বাবা আবদুল বাতেন হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার খরচ জোগাতে একে একে বিক্রি হয়ে যায় ভিটেমাটি। এখন উপজেলার কামালখামার বাজারের একটি ভাড়া দোকানঘরই তাদের আশ্রয়। সেই ঘরেই বসবাস, সেখান থেকেই শুরু হয় প্রতিদিনের সংগ্রাম।
সংসার চালানো, বাবার ওষুধ কেনা সব দায়িত্ব এসে পড়েছে সাজিদের কাঁধে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে টিকে আছে তাদের জীবন।
শিশু সাজিদ হোসেন বলে, ‘আমার অটো চালাইতে ভালো লাগে না। বন্ধুরা স্কুলে যায়, আমি ওই টাইমে অটো লইয়া রাস্তায় ঘুরি। খুব খারাপ লাগে, কিন্তু কী করম? পেটের দায়ে গাড়িটা চালাইতে হয়। প্রায় প্রতিদিন বাবার ওষুধও কিনতে হয়। বাসা ভাড়া, খাওয়া ম্যালা খরচ।’
সাজিদের বাবা আবদুল বাতেন বলেন, ‘হৃদ্রোগ হইবার পর আর কাম করতে পারি না। যা জমি ছিল, চিকিৎসা করতে করতে শেষ। পরে বাড়িঘর বেঁচে এই অটো কিনছি। আমি তো চালাইতে পারি না, তাই ছেলেই চালায়। এই অটো চার্জ দেওয়ার ঘরেই থাকি আমরা।’
শুধু সাজিদ নয়, কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এমন আরও অনেক শিশু রয়েছে, যারা দারিদ্র্যের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়েছে। জেলা শহরের লেদ কারখানাগুলোতেও দেখা যায় শিশু শ্রমিকদের উপস্থিতি।
শাপলা চত্বরের কাছে একটি লেদ কারখানায় কাজ করে আল আমিন ও সাব্বির রহমান। সাব্বির জানায়, তার বাবা সেলুনে কাজ করেন। পরিবারের অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি সে। এখন গ্যাস ঝালাইসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। ‘অনেক সময় আগুনের ফুলকি চোখে পড়ে, হাতে ছ্যাঁকা লাগে। কিন্তু কিছু করার নাই। অভাব তো!’ এ কথা বলে সাব্বির অন্যদিকে তাকায়।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দারিদ্র্যই শিশুশ্রম বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্কফোর্স (এনসিটিএফ) কুড়িগ্রাম জেলার শিশু অধিকারকর্মী খাদিজা আক্তার বলেন, ‘গত ১০ বছরে আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জেলায় শিশুশ্রম বাড়ছে। শিশুদের শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে পরিবারগুলোর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।’
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজাদুল ইসলাম বলেন, কুড়িগ্রামে বড় শিল্পকারখানা কম থাকায় শিশুশ্রম তুলনামূলক কম হলেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। লেদ কারখানা ও ঝালাইয়ের মতো কাজে যে শিশুদের দেখা যায়, তাদের তালিকা করে পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনলে শিশুশ্রম কমানো সম্ভব। তিনি আরও জানান, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে শিশুশ্রম কমাতে সহায়তা করছে।