আবাসন প্রকল্পটি কৃষিবিদ গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের একটি প্রকল্প। এটি সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের কমলাপুরে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, কৃষিবিদ সিটির প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে প্লট রয়েছে ৩ হাজার ২৫০টি। 

গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম সালাউদ্দিন জমি দখলসহ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা তো আমার জানা নেই। এ ধরনের ঘটনা কখনো ঘটেছে বলেও মনে হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের আবাসন প্রকল্পের ভেতরে কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে। সেগুলোতে জমির মালিকেরা নিজেদের মতো চাষাবাদ করছেন। প্রকল্পের ভেতরে ঢোকার সময় নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়।’

অবশ্য ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা নানা অভিযোগ করছেন। অভিযোগ নিয়ে তাঁরা পুলিশের কাছেও যাচ্ছেন। মো. সফি উদ্দিন শেখ নামের এক ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে আমাদের জমি থেকে গাছ ও মাটি কেটে নিয়ে গেছে আবাসন প্রকল্পের লোকজন। আমাদের ৭ জনের মালিকানায় সিরাজের টেক মৌজার প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির চারপাশে বাউন্ডারি (সীমানাপ্রাচীর) দিয়ে দিয়েছে।’ গত বছরের শেষের দিকে এ ব্যাপারে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে কোনো সমাধান হয়নি বলে জানান সফি উদ্দিন। 

জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার ওসি দীপক চন্দ্র সাহা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সম্প্রতি এই থানায় যোগ দিয়েছেন। অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন। 

মুক্তিযোদ্ধার জমি দখলের অভিযোগ

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু হেনা মো. কামাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের ভেতরে তাঁর ১৩৮ শতাংশ জমি রয়েছে। ওই জমি অদলবদলের (এওয়াজ) জন্য ২০১৮ সালে কৃষিবিদ সিটির সঙ্গে তাঁর লিখিত চুক্তি হয়। চুক্তি অনুসারে, প্রকল্পটির ভেতরে থাকা জমির বদলে তাঁকে কালিয়াকৈরে কৃষিবিদের মালিকানায় থাকা জমি দেওয়ার কথা। কিন্তু পরে তারা সেই চুক্তি মানেনি। উল্টো তাঁর জমি দখল করেছে। 

আবু হেনা মো. কামাল আরও বলেন, ‘আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আমার একটি জমিতে বাড়ি বানানোর কাজ শুরু হয়েছে। অন্য একটি জমিতে অবৈধভাবে ঘর তুলেছে কৃষিবিদ সিটি।’ 

এই অভিযোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম সালাউদ্দিন বলেন, ‘ওনার (আবু হেনা) জায়গা ওনার কাছেই রয়েছে। সাত-আট বছর আগে জমির এওয়াজ বদলের একটি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। উনি চাইলে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেব।’ 

অবশ্য আবু হেনা মো. কামাল অভিযোগ করেন, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তিনি বিভিন্ন সময় কৃষিবিদ সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছেন। উকিল নোটিশও দিয়েছেন। কিন্তু তারা কর্ণপাত করেনি। পরে তাঁকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। গত ডিসেম্বরে সাভার থানায় তিনি একটি জিডি করেন।

বন বিভাগের জমি 

বন বিভাগ বলছে, কমলাপুর মৌজার বন বিভাগের মালিকানায় থাকা ১ দশমিক ৮২ একর জমি কৃষিবিদ সিটি কিনে নিয়েছে বলে তারা দাবি করছে। ওই কেনাবেচা হয়েছে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে। ওই জমির বাজারমূল্য প্রায় দেড় শ কোটি টাকা। জালিয়াতির মাধ্যমে বনের জমি বিক্রি ও কেনার অভিযোগে ২০২১ সালের অক্টোবরে কালিয়াকৈর রেঞ্জের সাভার সাব-বিটের বন কর্মকর্তা শহীদুল আলম আদালতে মামলা করেন।

কৃষিবিদ সিটির কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগও অস্বীকার করে। তাদের দাবি, তারা খাজনা দেওয়া ও নামজারি করা জমিই কিনেছে। ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরে ফোন করে জানতে চাইলে কৃষিবিদ সিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বন বিভাগের কিছু জমি তাদের প্রকল্পের মধ্যে আছে। তবে এর পরিমাণ খুব কম। 

রাস্তা কাটার অভিযোগ

প্রকল্প–সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, আবাসন প্রকল্পের একটি অংশে আগে জনসাধারণের চলাচলের জন্য একটি মাটির রাস্তা ছিল। রাস্তাটি সরকারি। তবে আবাসন প্রকল্প হওয়ার পর ওই রাস্তার কিছু অংশ রেখে বাকিটা কেটে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয় জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের সুবিধার জন্য মালিকপক্ষ প্রভাব খাঁটিয়ে রাস্তা কেটেছে।

এদিকে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, কৃষিবিদ সিটি মানুষের জমি দখল করা, মাটি ও গাছ কেটে নেওয়া এবং হয়রানি করতে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে। বিপ্লব রোজারিও নামের এক ব্যক্তি বলেন, তাঁকে গত ২২ মে মারধর করেছে ওই সন্ত্রাসীরা। কৃষিবিদ সিটি তাঁর জমি দখল করতে চায়। তিনি এ বিষয়ে সাভার থানায় জিডি করেছেন।