আলাপচারিতায় রাজু জানালেন, তাঁদের বাড়ির পাশেই হাকালুকি হাওর। এলাকায় মৎস্যজীবীদের সংখ্যাই বেশি। তাঁদের কাছ থেকে মাছ কিনে স্থানীয় কানুনগো বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।

ফেলে আসা ‘শিকারি’ জীবন প্রসঙ্গে রাজু বললেন, খুব খারাপ কাজে জীবনের একটা সময় কেটেছে। নানা জাতের পাখি ধরতেন তিনি। হাওরে সারা বছরই পাখি থাকে। শীতের সময় পরিযায়ী পাখিরা বেশি আসে। ডাহুক, কালিম, ময়না, কুড়া, শালিক সব পাখিই ধরতেন। পাখি ধরে খাঁচায় রাখতেন, পুষতেন। অনেকে এসে তাঁর কাছ থেকে পাখি কিনত। এভাবে অনেক টাকা আয় করতেন।

রাজু বলেন, ‘শীতের সময় সরকারি অফিসার, ধনী মানুষ প্রায় হাওরো বেড়াইতে আইয়া আমার খোঁজ করতা। খাইবার লাগি, পুষার লাগি অনেকে পাখি চাইতা। তাঁরারে ব্যবস্থা করি দিতাম।’

২০২০ সালের দিকে হাকালুকি হাওরের স্থানীয় হাল্লা বিটে বনপ্রহরী পদে যোগদান করেন মোতাহার হোসেন। এলাকাবাসীর কাছ থেকে তিনি রাজুর সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর রাজুকে ওই পথ থেকে ফেরানোর পরিকল্পনা নেন তিনি। রাজু তাঁকে দেখলেই ভয়ে এড়িয়ে চলতেন। এভাবে কিছুদিন কাটে। এক সময় দুজনের দেখা হয়, কথা হয়। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।

রাজু বললেন, ‘মোতাহার স্যারে আমার জীবন পাল্টাই দিছইন। তাইন বুঝাইলা, পাখি শিকার অন্যায়, অপরাধ। হাতেনাতে ধরা খাইলে মামলা-জেল হইব। অনেক চিন্তা করি দেখলাম, আসলেই এইটা খারাপ কাম। তারপর এইটা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এক দিন নিজেই খাঁচা থাকি সব পাখি বাইর করি ছাড়ি দিলাম। তারা মুক্ত হইল। কী খুশি লাগল তখন। দাঁড়াই দাঁড়াই দেখলাম। এরপর থাকি আর পাখি ধরিও না, বেচিও না। এই জীবন ছাড়ি ফিরিয়া আইলাম।’ এ কথা বলতে বলতে রাজুর চোখ ভিজে ওঠে। হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে রাজু বললেন, ‘এখন কেউ পাখি ধরলে গিয়া বাধা দেই, বুঝাই। কেউ মানে, কেউ মানে না।’

বনপ্রহরী মোতাহার হোসেন বললেন, ‘রাজু এখন আমাদের সহকর্মীদের মতোই। পাখি শিকারের জন্য বন্দুক নিয়ে কেউ হাওরে ঘোরাঘুরি করলে সবার আগে রাজুই খবর দেন। তাঁর মতো অন্যরা পাল্টে গেলে হাওর এলাকায় পাখিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীদের আবাস নিরাপদ থাকত।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন