কাউয়াদীঘি হাওরপারে ফুল-পাতায় লেগেছে বসন্তের হাওয়া
মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের গ্রামগুলোর গাছে গাছে এখন বসন্তের হাওয়া লেগেছে। বসন্তের এখন মধ্যকাল। পাতা ও ফুলের অপরূপ আনন্দ গাছে গাছে। খালপারের ঘাসে, বুনো লতাঝোপ—সবখানে এখন নতুনের ছোঁয়া। সবকিছুতে যেন চলছে হাওয়া বদল।
গত মঙ্গলবার বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওর এলাকায় যাওয়ার পথে চোখে পড়ে, গ্রামগুলোয় এখন বসন্ত বাতাসের ঢেউ মেতে আছে। মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের চাঁদনীঘাট থেকে উত্তরে নতুন ব্রিজ সড়কের জগৎপুর থেকে অন্তেহরির দিকে চলে গেছে একটি গ্রামীণ সড়ক। এই সড়কটি গেছে কাউয়াদীঘি হাওরের দিকে। জগৎপুর থেকে হাওরের দিকে কাদিপুর পর্যন্ত পাকা সড়ক। এক মাস আগেও সড়কের দুই পাশে পাতাঝরা গাছেরা দাঁড়িয়ে ছিল। ছোট-বড় খালপাড়ের ঝোপলতারাও যেন এই সময়টিতে শীতঘুমে ছিল। বসন্ত আসতেই হাওরপারের এসব গাছে, ঝোপলতায় সাড়া পড়েছে।
সড়কের দুপাশে কাদিপুর, অন্তেহরিসহ যেসব গ্রাম পড়েছে, সেসব গ্রামের গাছপালায় এখন নতুন ফুল-পাতার উচ্ছল সমাবেশ। পথের দুপাশে, বাড়ির উঠানের কাছে, পুকুরপাড়ে, খালপাড়ে গাছে গাছে অসংখ্য বরুণ ফুল ফুটেছে। যেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা—‘বরুণরানি ফিরছে যেথা, মুক্তপ্রদীপ জ্বলে।’ গাছের ছোট-বড় ডালে সবুজ পাতার ফাঁকে সাদা, গোলাপি, সবুজের মিশ্রণে মুক্তপ্রদীপ হয়ে জ্বলছে বরুণ ফুল। বরুণগাছে সাধারণত বসন্তের মাঝামাঝি থেকে ফুল আসা শুরু করে। মাসজুড়ে ফুলের এই বন্যা থাকে। সাদা ও হালকা বেগুনি আঁশযুক্ত ফুল ফোটে। ফুল ঝরে যাওয়ার পরপরই গাছে কতবেলের মতো ফল আসে। গাছটির পছন্দ জলাভূমি এলাকা। কাউয়াদীঘি হাওরপারে এখন বরুণ ফুলের মেলা বসেছে।
খালের পাড়ে, বাড়ির কাছে, সড়কের দুই পাশে এখন অসংখ্য হুরহুরে ফুলেরও দেখা মিলছে। বেগুনি রঙের চোখজুড়ানো এই ফুল। কোথাও একা, দু–একটা, কোথাও ঝাঁকে ঝাঁকে ফুল ফুটে আছে। সাদা-বেগুনি, সাদা-গোলাপি পাপড়ির ফুল। সবুজ পাতার ফাঁকে, ডালের মাথায় ঝোপালো ফুল ফুটে আছে। অন্তেহরি গ্রামে বেগুনি রঙের ভিড়ে একঝাঁক সাদা হুরহুরের দেখা মিলেছে। বেগুনির মধ্যে বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে সাদা ফুল। হুরহুরে ফুলকে নুনিরলতা বা হুলহুলে নামেও ডাকা হয়। পুংকেশর মাকড়সার মতো চারপাশে ছড়িয়ে থাকে বলে ইংরজিতে ‘ওয়াইল্ড স্পাইডার ফ্লাওয়ার’ বা বন্য মাকড়শা ফুল নামেও এর পরিচিতি আছে।
আরও আছে ভাঁটফুল। যেদিকেই চোখ যায়—ভাঁটফুল ফুটে আছে। যত্ন ছাড়াই আপন মনে ফুটেছে হাওরপারে। এত দিন যেসব হিজলগাছের পাতা ঝরে ডালপালা রিক্ত হয়ে ছিল, সেসব গাছের শাখা এখন পিত ও লালচে রঙের নতুন পাতায় জেগে উঠেছে। করচগাছ এমনিতেই চিরসবুজ। ঘন ডালপালার মাঝারি আকারের বহুবর্ষজীবী একটি উদ্ভিদ। এই গাছেও এখন বসন্তের হাওয়া লেগেছে। ঘন হয়ে থাকা পাতারা চকচক করছে গাছে গাছে। গাছগুলো যেন সবুজ মমতা দিয়ে আগলে রেখেছে চারপাশ। বিল–ডোবায় বেগুনি-সাদায় ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটে আছে কচুরিপানা। হাওরপারের গ্রামগুলোয় এখন গাছেরা ফুল ও পাতার অনন্য সৌন্দর্য ছড়িয়ে রেখেছে।