হোটেল ভাড়ায় ৬০ শতাংশ ছাড়, তবু ফাঁকা কক্সবাজার

পর্যটক না থাকায় ফাঁকা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। গতকাল দুপুরে কলাতলীতেছবি: প্রথম আলো

সকাল ১০টা, কলাতলী সৈকত। এক কিলোমিটারজুড়ে পাঁচ শতাধিক চেয়ার-ছাতা সাজানো। কিন্তু আছেন মাত্র পাঁচজন পর্যটক। ঢেউ ভাঙছে, বাতাস বইছে, অথচ পানিতে নামার মানুষ নেই। দূরে একটি জলযান (জেটস্কি) ভাসছে। চালক অপেক্ষায়, যাত্রী নেই।

গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত কলাতলীর উত্তর দিকের সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী পয়েন্ট ঘুরেও একই দৃশ্য দেখা গেল। পাঁচ কিলোমিটার সৈকতজুড়ে পর্যটক একেবারে কম। পর্যটক না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক অন্তত তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কয়েক শ ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রী ক্যামেরা হাতে বসে আছেন, ৩৫টি ঘোড়া অলস দাঁড়িয়ে। শতাধিক বিচ-বাইক সারি করে রাখা। শামুক-ঝিনুক ও সামুদ্রিক পণ্যের দেড় শতাধিক দোকানে ক্রেতা নেই।

অথচ কয়েক দিন আগেও ছিল ভিন্ন চিত্র। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি কলাতলী থেকে লাবণি পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতে দেড় লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম হয়েছিল। রমজানে পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট কক্ষভাড়ায় সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। দুই হাজার টাকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ ৮০০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

রোজা শুরুর পর থেকে সেই ছাড়েও সাড়া মিলছে না। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সৈকত প্রায় পর্যটকশূন্য, ফাঁকা কক্সবাজার। জানতে চাইলে কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে জানান, রমজানে পর্যটক কম আসে। এটি নতুন নয়। গত বৃহস্পতিবার শহরের হোটেলগুলোতে ছিলেন প্রায় তিন হাজার অতিথি। গতকাল তা সাড়ে তিন হাজারে উঠলেও আজ শনিবার থেকে দেড় হাজারে নেমে যেতে পারে। বর্তমানে পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও কটেজের ৯৫ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে।

পর্যটকের আনাগোনা না থাকায় সড়কও ফাঁকা। গতকাল দুপুরে কলাতলীতে
ছবি: প্রথম আলো

নির্জনতার আনন্দ, সেবায় সংকট

নির্জন সৈকতে বসে সমুদ্র দেখছিলেন ঢাকার মিরপুরের সুজা উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী কামরুন নাহার। দেড় বছর আগে বিয়ে হয় এ দম্পতির। উঠেছেন সৈকতসংলগ্ন একটি তারকা হোটেলে।

সুজা উদ্দিন বলেন, রমজানে অনেকে অফিস-বাসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ঘুরতে আসেন না। কিন্তু তাঁদের কাছে সময়টি আলাদা। এ সময় পরিবার নিয়ে প্রকৃতির কাছে আসা যায়। নির্জন সৈকতে বসে ঢেউয়ের শব্দ শোনা অন্য রকম অভিজ্ঞতা।

তবে এই নির্জনতায় ভোগান্তিও আছে। সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণি পয়েন্টের কয়েক শ দোকানপাট ও শতাধিক রেস্তোরাঁ বন্ধ। ফলে হাতে গোনা পর্যটকেরাও খাবার–সংকটে পড়ছেন। কুমিল্লার দেবীদ্বারের ব্যবসায়ী সৈয়দুল কবির বলেন, পরিবেশ ভালো লাগছে, কিন্তু খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় শিশুদের নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে কিছু রেস্তোরাঁ খোলা থাকলে সুবিধা হতো।

কক্সবাজার শহরে সাত শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। সৈকত এলাকায় ভাজা মাছসহ খাবার বিক্রির প্রায় ৩০০ ভ্রাম্যমাণ ভ্যানও আছে। রমজান উপলক্ষে প্রায় সবই বন্ধ। তবে কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে কেএফসি, পিৎজাহাটসহ কিছু রেস্তোরাঁ খোলা রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকেলে ইফতারসামগ্রী বিক্রি করছে।

কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, রমজানে কর্মচারীদের ছুটিতে পাঠানো দীর্ঘদিনের চর্চা। এ বছর ৫০ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রায় ৩২ হাজারকে অগ্রিম বেতন-ভাতা দিয়ে ছুটি দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট কর্মীরা সীমিত পরিসরে হোটেল-রেস্তোরাঁ দেখাশোনা করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে চলছে সংস্কার ও রঙের কাজ। ব্যবসায়ীদের আশা, ঈদুল ফিতরের দ্বিতীয় দিন থেকে আবারও পর্যটকে ভরপুর হবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। তখন চাঙা হবে হোটেল, দোকান, বিনোদনকেন্দ্র।