কুমিল্লায় রাতের আঁধারে কাটা হলো শতবর্ষী ৭টি গাছ, নগরবাসীর ক্ষোভ
কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ থেকে মেডিক্যাল কলেজ সড়কে শতবর্ষী সাতটি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সড়ক প্রশস্ত করার কথা বলে সম্প্রতি রাতের আঁধারে গাছগুলো কাটা হয়।
এ ছাড়া কুমিল্লা ইপিজেডের সীমানাপ্রাচীর লাগোয়া এলাকা থেকে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী অন্তত ৩০টি বিভিন্ন ধরনের গাছ কাটা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকেরা।
টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়কের পাশে আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের মূল ফটকের দুই পাশে শতবর্ষী দুটি রেইনট্রি গাছ ছিল। বিশালাকৃতির গাছগুলো দেখে সবাই মুগ্ধ হতেন। আজ বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গাছগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। সড়কের ডান পাশে উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় ঘেঁষে পড়ে আছে বড় বড় কয়েকটি গুঁড়ি।
উপজেলা পরিষদ থেকে একটু সামনে যেতেই হাউজিং এস্টেট গোলমার্কেট সড়কের মাথায় ২০০ বছরের বেশি পুরোনো একটি বটগাছ ছিল। আজ বুধবার সরেজমিন দেখা গেল, গাছটির গোড়ার অংশ উপড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ঢুলিপাড়া এলাকায় নার্সারির সামনে ও কুমিল্লা কেটিসিসির সামনে আরও দুটি শতবর্ষী রেইনট্রি গাছ কাটা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় ২০ দিন আগে রাতের আঁধারে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়। পরে টুকরা টুকরা করে নিয়ে যাওয়া হয়। গাছগুলো পুরো এলাকায় ছায়া দিত। টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। ওই কাজের জন্য গাছগুলো কাটা হয়েছে বলে তাঁরা জানেন।
টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়কটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের আওতাধীন। বর্তমানে সড়কটির উন্নয়নকাজ করছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।
গাছগুলো কারা কেটেছে জানতে চাইলে সওজের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘সড়কটি সওজের হলেও সিটি করপোরেশন আমাদের না জানিয়ে গত বছর দরপত্র আহ্বান করে। এরপর ঠিকাদার কাজও শুরু করেন। পরে আমাদের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে এবারের জন্য তাদের উন্নয়নকাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গাছগুলো কীভাবে কাটা হয়েছে, সেটা আমি বলতে পারব না। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনই ভালো বলতে পারবে।’
জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন-উদ্দিন চিশতী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বা চলমান কাজের ঠিকাদার কোনো গাছ কাটেননি। গাছগুলো সওজ নিলামের মাধ্যমে ২০২০ সালে বিক্রি করলে কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সওজের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী হয়তো বিষয়টি জানেন না। এ জন্য তিনি বলতে পারছেন না। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই গাছগুলো কাটা হয়েছে বলে জেনেছেন। এখন সিটি করপোরেশন কাজ করছে বলে অনেকে মনে করছেন, তারা গাছগুলো কেটেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে কিছুই জানে না।’
আদর্শ সদর উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম সড়ক প্রশস্ত করতে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কাগজপত্র ঘেঁটে জানতে পেরেছি, ২০২০ সালে মোট সাতটি পুরোনো গাছ নিলামের মাধ্যমে কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করে সওজ। সাতটি গাছের মধ্যে দুটি মেহগনি আর বাকি পাঁচটি রেইনট্রি। বটগাছটি বুনো গাছ হওয়ায় সেটি নিলামের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ওই সাতটি গাছের মধ্যে একটি কোনো কারণে কয়েক বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছিল। এখন ছয়টি কাটা হয়েছে। এগুলো সওজের নিলামে পাওয়া ঠিকাদার বা তাঁর পক্ষের লোকজনই কেটেছেন বলে জেনেছি।’
২০২০ সালের নিলামে ২০২৬ সালে কীভাবে গাছ কাটা হচ্ছে—জানতে চাইলে সওজের কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আদনান ইবনে হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামে এসব গাছকাটার প্রক্রিয়া শুরু হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক বছর সময় লাগে। এই ক্ষেত্রেও তেমনটা হতে পারে, এটা অস্বাভাবিক কিছু না।’
শতবর্ষী গাছ কাটায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর। তিনি বলেন, ‘গাছগুলো ঠিক কবে লাগানো হয়েছে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আকার দেখেই বোঝা যায়, এগুলো শতবর্ষী। নিলামের ছয় বছর পর কীভাবে গাছগুলো কাটা হলো, এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। ২০০ বছরের পুরোনো বটগাছটি না কাটলেও পারত। এভাবে শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলার আগে বেশি করে গাছ লাগানোর দরকার ছিল। তা না করে উল্টো পরিবেশের বারোটা বাজানো হচ্ছে।’