তাঁদের কোনো পুঁজি ছিল না। ছিল শুধু প্রতিদিনের রান্নার চাল থেকে একমুঠো করে সঞ্চয় করার সামর্থ্য। সেই সঞ্চয় দিয়েই শুরু। ৭০ জন নারী এক মাসে প্রতিবেলায় একমুঠো করে জমিয়ে যে চাল হতো তাই দিয়ে চারজনকে কিনে দেওয়া হতো হাঁস–মুরগি। এভাবে ১৭ মাসের মধ্যে ৭০ জনই পেলেন ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাথমিক সম্বল। পরের ধাপে সপ্তাহে ৭০ টাকা করে সঞ্চয় করা শুরু করলেন তাঁরা। মাস শেষে যা দিয়ে গরু–ছাগল কিনে দেওয়া শুরু হয় সদস্যদের।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার পাতাইপাড়া গ্রামে মুঠো মুঠো চাল দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা এখন হস্তশিল্পে পৌঁছেছে। উদ্যোক্তা মারজাহান ইয়াসমিনের নেতৃত্বে পাতাইপাড়া ও আশপাশের গ্রামের প্রায় ৩০০ নারী নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। সংসারে এসেছে সচ্ছলতা। সব মিলিয়ে দারিদ্র্যের আঁধার কাটিয়ে আলোকিত এক গ্রাম হয়ে উঠেছে পাতাইপাড়া।
গ্রামের বাসিন্দা ও হারিয়ালকুটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আছিমুদ্দীন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, মারজাহানের চেষ্টায় গ্রামটি এখন অভাবমুক্ত। নারীরা বাড়িতে নকশা ও হস্তশিল্পের কাজ করে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন। এ গ্রামের নারীদের দেখে পাশের গ্রামের নারীরাও বাড়তি আয় করতে নকশা ও হস্তশিল্পের কাজে ঝুঁকছেন।
অভাব নাড়া দেয় মারজাহানকে
তারাগঞ্জ উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামে ১৯৯৪ সালে জন্ম মারজাহানের। সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট মারজাহান ২০১২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। একই বছর তাঁর বিয়ে হয় পাতাইপাড়া গ্রামের শাহাজাহান সরকারের সঙ্গে। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে দেখেন গ্রামটির বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুর। গ্রামের বাইরে গিয়ে কাজ পেলে খাবার জুটত, কাজ না পেলে অনাহারে।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো একদিন গ্রামের স্বামীহারা আয়শা বেগম সন্তানের জন্য মারজাহানের কাছে একটু ভাত চাইতে আসেন। তিনি আয়শার হাতে ভাত তুলে দেন। পরদিন স্বামীর কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নিয়ে আয়শাকে দেন গ্রামে ঘুরে ঘুরে শাড়ি কাপড় বিক্রির ব্যবসার জন্য। এ নিয়ে শাশুড়ি রাহেনা বেগমের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়। অভিমানে চলে যান বাবার বাড়ি। স্কুলশিক্ষক বড় বোন মাহমুদা আক্তার সব শুনে মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য মারজাহানকে উৎসাহ দেন।
এরই মধ্যে জানতে পারেন পাশের পঞ্চায়েতপাড়া গ্রামের আরজিনা খাতুন ৪০ জন নারীকে নিয়ে মুষ্টির চাল জমিয়ে হাঁস-মুরগি, গাভি-ছাগল কিনে ভাগ্যের চাকা বদলে ফেলেছেন। ওই গল্প মারজাহানকে উৎসাহিত করে। আরজিনার কাছে গিয়ে সব কৌশল শিখে আসেন।
১০ দিন পর মারজাহানকে ফিরিয়ে আনেন স্বামী–শাশুড়ি। তাঁদের তিনি পঞ্চায়েতপাড়া গ্রামের নারীদের ভাগ্যবদলের গল্প শোনান। নিজেও একটি সংগঠন করার ইচ্ছার কথা জানান। প্রথমে তাঁরা রাজি হননি। তবে মারজাহান জেদ ধরলে মানাও করেননি তাঁরা। বাড়ি ফিরে গ্রামের নারীদের বোঝাতে বেরিয়ে পড়েন মারজাহান। তাঁর ডাকে সাড়া দেন নারীরা।
মুষ্টির চাল দিয়ে শুরু
২০১৬ সালের ৯ মে ৭০ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে ‘মানবসেবা সংগঠন’ গড়ে তোলেন মারজাহান। স্বামীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে ৭০ জন নারীকে তিনি ৭০টি মাটির পাতিল কিনে দেন। প্রতিবেলায় রান্না করার জন্য নেওয়া চাল থেকে ওই পাতিলে এক মুষ্টি করে চাল তুলে রাখতে বলেন। এক মাস পর লটারি করে চারজনকে হাঁস–মুরগি কেনার জন্য চাল বিক্রির টাকা দেওয়া হয়। একইভাবে পরের মাসে পান আরও চারজন।
সংগঠনের প্রাথমিক এই সাফল্য আত্মবিশ্বাসী করে মারজাহানকে। চালের পরিবর্তে সদস্যদের কাজ থেকে সপ্তাহে ৭০ টাকা করে জমা নেন। একইভাবে লটারি করে ছাগল, গাভি কেনার জন্য দেওয়া হয় এ টাকা।
ইউটিউবে দেখে হস্তশিল্প
মারজাহান ভাবতে থাকেন কীভাবে নারীদের কর্মমুখী করা যায়। ২০১৮ সালে তিনি ইউটিউবে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ফরিদা বেগম নামের এক নারীর খোঁজ পান। জানতে পারেন ফরিদার অধীনে নকশা ও হস্তশিল্পের কাজ করে স্থানীয় নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। বিষয়টি মারজাহান তাঁর স্বামীকে জানান। স্বামীর সহযোগিতায় ফরিদার বাড়িতে ১০ দিন থেকে মারজাহান শিখে নেন সেই কাজ। বাড়িতে ফিরে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সবাই তাতে আগ্রহ দেখান।
একই বছর মারজাহান তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগিয়ে দেন। ফরিদার সহযোগিতায় বিভিন্ন শোরুমে ও অনলাইনে পণ্য বিক্রি শুরু করেন। বিভিন্ন মেলাতেও প্রদর্শনীর আয়োজন করায় এসব পণ্যের বাজার তৈরি হয়।
নকশা ও হস্তশিল্পের কাজ করে সংগঠনের সদস্যরাও হয়ে ওঠেন স্বাবলম্বী। এতে পাশের গ্রামের নারীদেরও অনুপ্রাণিত করেন। তাঁরাও ভিড়তে থাকেন মারজাহানের কাছে। এখন মাদ্রাসাপাড়া, পাতাইপাড়া, শন্তিপাড়া, মমিনপুর, ঘোনপাড়া, হাজীপাড়া, হাতীবান্ধা, উজিয়াল গ্রামের প্রায় ৩০০ অভাবী নারী যুক্ত এই কাজে। তাঁরা কাপড়ে বিভিন্ন নকশার কাজ ছাড়াও ব্যাগ, শিকা, পাপোশ, ঝুড়ি, ওয়ালম্যাট, রানার, টেবিলম্যাট তৈরির কাজ করেন। সংসারের কাজের ফাঁকে যাঁরা বেশি সময় দেন তাঁরা মাসে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা আয় করেন। যাঁরা কিছুটা কম সময় দেন তাঁরা তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করছেন।
মারজাহান ইয়াসমিন জানান, একেকটি পাঞ্জাবিতে নকশার কাজে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, ফতুয়ায় ৫০০ টাকা, শাড়িতে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পান নারীরা। এর মধ্যে প্রতিটি পণ্যে ৩০ টাকা কমিশন নেন মারহাজান, যা তাঁর যাতায়াত খরচের পাশাপাশি সংগঠনের কাজে ব্যয় হয়। এ ছাড়া ফরিদপুর থেকে পাট ও বরিশাল থেকে হোগলাপাতা এনে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন তাঁরা। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেন তিনি।
হারিয়ালকুটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কুমারেশ রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘মারজাহান দরিদ্র নারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড আমি দুইবার পরিদর্শন করেছি। তাঁকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
পাতাইপাড়া গ্রামে একদিন
সম্প্রতি এক সকালে রংপুর সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পাতাইপাড়া গ্রামে ঢুকে চোখে পড়ে নানামুখী উৎপাদন কর্মকাণ্ড। প্রতিটি বাড়ির উঠানের পাশে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও মসলাখেত। উঠানে হাঁস–মুরগি ও গরু-ছাগলের বিচরণ। গ্রামের নারীদের অনেকেই নকশা ও পাট দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছেন।
মারজাহানের বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখা যায়, তিনি নারীদের হস্তশিল্পের কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন। সেখানে কাজের ফাঁকে কয়েকজন দিনবদলের গল্পও শোনালেন। তাঁদের বাড়িতে কুঁড়েঘরের বদলে টিনের ঘর উঠেছে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। নিজেদের হাঁস, মুরগি, গাভি, ছাগল আছে।
ওই গ্রামের সুফিয়া বেগম জানালেন, সাত বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। এরপর অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন। তবে তাঁর এখন হাঁস, মুরগি ও দুটি গাভি আছে। অন্যের বাড়িতে কাজ করা ছেড়েছেন অনেক আগেই। এসবই হয়েছে মারজাহানের পরামর্শে হস্তশিল্পের কাজ করে।
গ্রামের মেয়ে সুইটি বেগমের আট বছর আগে বিয়ে হয় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের বাংলাবাজার গ্রামে। দারিদ্র্যের কারণে সেখানে টিকতে না পেরে দিনমজুর স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। মারজাহানের পরামর্শে সমিতির সদস্য হন। শুরু করেন নকশা ও হস্তশিল্পের কাজ। এখন তিনি কাজের পাশাপাশি হাঁস–মুরগি, গরু-ছাগল পালন করে মাসে আয় করছেন ১২ হাজার টাকা।
সুলতানা বেগমের স্বামী সেকেন্দার আলী দিনমজুরি করতেন। হস্তশিল্পের কাজ করার আগে তাঁদের সংসারে অভাব লেগেই ছিল। এখন তিন বেলা খাবার জুটছে। সুলতানা বলেন, ‘সেই কষ্ট আর নেই। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। মারজাহান আপার পরামর্শে এত কিছু হইছে।’
সমিতির হিসাবরক্ষক রাশেদা খাতুন বলেন, সমিতির তহবিলে এক লাখ টাকা জমা আছে। গরিব ঘরের মেয়ের বিয়েতে সমিতি থেকে সহযোগিতা করা হয়। নিরক্ষর গৃহবধূদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌতুক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
ভুল ভেঙেছে মারজাহানের শাশুড়ির
মারজাহানের স্বামীর চার একর জমি আছে। চাষাবাদের পাশাপাশি ধান–গমসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করেন তিনি। বড় মেয়ে সিঁথি আক্তার সপ্তম ও ছেলে সিফাত ইসলাম প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। গাছপালাঘেরা পাকা বাড়িতে দুই সন্তান, শাশুড়ি আর স্বামীকে নিয়ে সুখের সংসার মারজাহানের।
শুরুতে মারজাহানের কাজে বিরক্ত শাশুড়ি রাহেনা বেগমের এখন ভুল ভেঙেছে। এক নারীকে সাহায্য করায় কথা শোনানোর কারণে মারজাহানের বাবার বাড়ি চলে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুই পরে বউমাক বাপের বাড়ি থাকি মোর বাড়ি আনছুন। বউমা এলা গ্রামের মানুষের উপকার করোছে। বউমার জন্য এলা গ্রামের সবার মোক সম্মানও করে।’
স্ত্রীর কাজে গর্বিত স্বামী শাহাজাহান সরকার। তিনি বলেন, ‘হাটবাজারে যখন অপরিচিত লোকজন স্ত্রীর কাজের প্রশংসা করেন, তখন গর্ব হয়, আনন্দে বুক ভরে যায়।’
অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়ায় মারজাহানের প্রশংসা করলেন তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোনাববর হোসেন। তিনি বলেন, ‘মারজাহান একজন সংগ্রামী নারী। তাঁর কর্মকাণ্ড আমি দেখেছি। তাঁর নেতৃত্বে নারীরা হস্তশিল্পের কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’
মারজাহানের স্বপ্ন, ধীরে ধীরে তিনি আশপাশের গ্রাম হয়ে পুরো উপজেলার দরিদ্র নারীদের নকশা ও হস্তশিল্পের কাজে যুক্ত করবেন। পাশাপাশি তাঁদের হাতের তৈরি পণ্য তিনি সরাসরি বিভিন্ন দেশে পাঠাবেন, যার সুবিধাভোগী হবেন গ্রামের নারীরা।