বিদেশে রপ্তানির পর এবার জিআই স্বীকৃতির অপেক্ষায় সাতক্ষীরার মাটির টালি

গত ২০ আগস্ট জিআই জার্নাল প্রকাশ করেছে সরকারের পেটেন্ট, শিল্প–নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)।

রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে সারি সারি কাঁচা মাটির টালি। সম্প্রতি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার তুজলপুর এলাকায়ছবি : প্রথম আলো

কারখানায় সারি সারি সাজানো বাহারি নকশার মাটির টালি। কোনোটির গায়ে ফুলের নকশা, কোনোটি ঘরের। কোনোটির আকার বর্গাকার, আবার কোনোটি আয়তাকার। একসময় এসব টালি তৈরিতে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার মুরারীকাটি এলাকার পালপাড়ায় ভীষণ ব্যস্ততা ছিল। এখন সেই ব্যস্ততা অনেকটাই কমেছে। কমেছে মাটির টালি তৈরির কারখানা, উৎপাদন ও রপ্তানি।

এরই মধ্যে এসেছে নতুন খবর—সাতক্ষীরার মাটির টালিকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। গত ২০ আগস্ট জিআই জার্নাল প্রকাশ করেছে সরকারের পেটেন্ট, শিল্প–নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)।

মাটির টালি হলো পোড়ামাটি বা কাদামাটি দিয়ে তৈরি পাতলা ও শক্ত বর্গাকার, আয়তাকার বা বিশেষ আকৃতির ফলক। এগুলো বিভিন্ন নির্মাণকাজ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যবহার করা হয়। ছাদ, মেঝে, দেয়াল, পার্কিং এলাকাতেও ব্যবহৃত হয়। টেরাকোটার এসব টালিতে ফুল, পশুপাখি ও গ্রামবাংলার নানা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জিআই জার্নাল নম্বর ৬৭-এ ‘সাতক্ষীরার মাটির টালি’ নিবন্ধনের আবেদন–সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জার্নাল প্রকাশের পর দুই মাস আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে। সে হিসাবে আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত আপত্তির সুযোগ রয়েছে। আপত্তি না এলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় নিবন্ধনের বিষয়টি এগোবে।

কাঁচা টালি তৈরির পর বিভিন্ন ধাপে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হয় বলে জানান কারখানার মালিকেরা। উৎপাদনের পরিমাণ অনুযায়ী অধিকাংশ শ্রমিক পারিশ্রমিক পান। শ্রমিকদের সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজের জন্য ৪০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়।

মুরারীকাটি এলাকার একটি টালি কারখানার মালিক ইমাদুর রহমান বলেন, বিদেশে টালি রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় সংকট তৈরি হয়েছে। জিআই নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় যেহেতু এগোচ্ছে, এটা নিবন্ধন পেলে তিনি আশা করছেন, ব্যবসা আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

ডিপিডিটির জিআই জার্নালে বলা হয়েছে, কলারোয়া ও আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে তৈরি এসব মাটির টালি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে টালি রপ্তানি হয়ে আসছে এবং প্রতিবছর রপ্তানি করে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়।

টালি কারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় কলারোয়ার বিভিন্ন এলাকায় ৪১টি টালি কারখানা গড়ে উঠেছিল। শুধু তুজলপুর এলাকাতেই ছিল ১৪টি। এখন সেখানে আছে তিনটি। সব মিলিয়ে কলারোয়ায় বর্তমানে ২০টি কারখানা সচল আছে। রপ্তানি কমে যাওয়া, শ্রমিকের সংকট, মাটির অভাব ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাকি কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২২ সালের আগে ১০ টাকায় বিক্রি করা একটি টালিতে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকলেও এখন সেই লাভ হচ্ছে না।

আমাদের পরিবার ১৯৪৭ সালের পর থেকেই মাটির তৈরি পণ্যের কাজের সঙ্গে যুক্ত। তবে ২০০২ সালের দিকে ইতালির ব্যবসায়ী রাফাইলো আলদোর আগ্রহের পর টালি তৈরির কাজে নতুন গতি আসে। এরপর কলারোয়া ও আশপাশে একের পর এক কারখানা গড়ে ওঠে।
গোস্ট চন্দ্র পাল, মুরারীকাটি পালপাড়ার বাসিন্দা

গত বৃহস্পতিবার সকালে কলারোয়ার তুজলপুর বাজার এলাকায় মনিরুজ্জামান বকুলের টালি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, তৈরি করা বিভিন্ন ধরনের টালি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে কথা হয়, মনিরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জিআই স্বীকৃতি পেলে বিশ্বে সাতক্ষীরার মাটির টালিশিল্পের একটা নতুন ব্র্যান্ডিং হবে। একসময় বিদেশের বাজারে কলারোয়ার টালির চাহিদা বেশি ছিল। তাঁদের তৈরি টালি অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। একবার তাঁর কারখানা থেকে ফ্রান্সে ১৩ কনটেইনার টালি পাঠানো হয়েছিল। পরে ওই ক্রেতা আরও ২০০ কনটেইনার টালির চাহিদা দিয়েছিলেন; কিন্তু ব্যবসায়িক সমস্যায় সেই কার্যক্রম আর এগোয়নি।

ডিপিডিটির জিআই জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালের দিকে ইতালির ব্যবসায়ী রাফাইলো আলদো বাংলাদেশে এসে মাটির টালি তৈরির উদ্যোগ নেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক রুহুল আমিন দেশের বিভিন্ন স্থানে উপযোগী মাটি খুঁজতে গিয়ে কলারোয়ার মুরারীকাটিতে এর সন্ধান পান। ২০০৩ সালের প্রথম দিকে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে টালি উৎপাদন শুরু হয় এবং ওই বছরই প্রথম ইতালিতে রপ্তানি করা হয়। পরে জার্মানি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি শুরু হয়। ইতালিতে রপ্তানির সূত্র ধরে স্থানীয়ভাবে মুরারীকাটি এলাকা ‘ইতালি নগর’ নামেও পরিচিতি পায়।

জেলার ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যকে আইনি সুরক্ষা দিতে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ‘সাতক্ষীরার মাটির টালি’ জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়। ইতিমধ্যে জিআই জার্নালে আবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি না এলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন চূড়ান্ত হবে।
কাউসার আজিজ, জেলা প্রশাসক, সাতক্ষীরা

মুরারীকাটি পালপাড়ার গোস্ট চন্দ্র পাল বলেন, ‘আমাদের পরিবার ১৯৪৭ সালের পর থেকেই মাটির তৈরি পণ্যের কাজের সঙ্গে যুক্ত। তবে ২০০২ সালের দিকে ইতালির ব্যবসায়ী রাফাইলো আলদোর আগ্রহের পর টালি তৈরির কাজে নতুন গতি আসে। এরপর কলারোয়া ও আশপাশে একের পর এক কারখানা গড়ে ওঠে।’

টালি তৈরিতে প্রয়োজন ভালো বেলে-দোআঁশ মাটি। মাটি বেছে পরিষ্কার করে পানি দিয়ে ভিজিয়ে প্রায় ১২ ঘণ্টা রাখা হয়। পরে মাটির দলা মিশিয়ে ছাঁচে টালি তৈরি করা হয়। রোদে ৭ থেকে ১৫ দিন শুকানোর পর চুলায় পোড়ানো হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শ্রমনির্ভর। নারী শ্রমিকেরাও মাটি তৈরি, কাঁচা টালি বানানো, পরিষ্কার ও শুকানোর কাজে যুক্ত। কারখানার নারী শ্রমিক লতা বেগম বলেন, বর্ষার কারণে এখন টালি বানানোর কাজ বন্ধ। বর্ষা কমলে আবার কাজ শুরু হবে। প্রতিটি টালি বানানোর জন্য তাঁরা ৬ টাকা ৭৫ পয়সা মজুরি পান। দিনে ১০০টি টালি বানালে পান ৬৭৫ টাকা।

বিদেশি ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নকশায় তৈরি করা হয়েছে মাটির টালি। কলারোয়া উপজেলার তুজলপুর বাজার এলাকায়
ছবি : প্রথম আলো

কাঁচা টালি তৈরির পর বিভিন্ন ধাপে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হয় বলে জানান কারখানার মালিকেরা। উৎপাদনের পরিমাণ অনুযায়ী অধিকাংশ শ্রমিক পারিশ্রমিক পান। শ্রমিকদের সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজের জন্য ৪০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, জেলার ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যকে আইনি সুরক্ষা দিতে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ‘সাতক্ষীরার মাটির টালি’ জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়। ইতিমধ্যে জিআই জার্নালে আবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি না এলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন চূড়ান্ত হবে।