কিরিচ হাতে কিশোর গ্যাংয়ের টিকটক ভিডিও, সেই কিরিচেই সপ্তাহখানেকের মধ্যে হত্যাকাণ্ড

ধারালো অস্ত্র হাতে কিশোরেরাছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সবার বয়স ১৪ থেকে ১৫ বছর। পাঁচ কিশোরের হাতে ধারালো অস্ত্র—কারও হাতে কিরিচ, কারও হাতে লোহার চাকতি। সড়কে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ভিডিও ধারণ করে সপ্তাহখানেক আগে সেটি টিকটকে ছড়িয়ে দিয়েছিল তারা। নিজেদের ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয় ওই কিশোরেরা। চট্টগ্রাম নগরের খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় গড়ে উঠেছে এই কিশোর গ্যাং।

পুলিশ বলছে, এলাকায় ‘ফাইভ স্টার’ নামে আরও একটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। দুই দলের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরে গত মঙ্গলবার রাতে ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় মো. হৃদয় (১৬) নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। হৃদয় তার বাবার সঙ্গে ভ্যানে করে সবজি বিক্রিতে সহযোগিতা করত।

এ ঘটনায় ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক। অন্য পাঁচজনের বয়স ১৪ থেকে ১৫ বছর। গ্রেপ্তার কিশোরদের একজনকে সপ্তাহখানেক আগে টিকটকে কিরিচ হাতে ভিডিও করতে দেখা গিয়েছিল। পুলিশ বলছে, ওই কিরিচ দিয়েই হৃদয়ের কানে কোপ দেওয়া হয়েছিল। পরে ঘটনাস্থলের পাশ থেকে রক্তমাখা কিরিচটি উদ্ধার করা হয়।

যেভাবে খুন করা হয়

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাতে হৃদয়কে তার ওয়্যারলেস কলোনির বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান মোহাম্মদ কামরুল (২৫) নামের এক যুবক। বাসার পাশে তালতলা এলাকায় পৌঁছালে আগে থেকে সেখানে অবস্থান নেওয়া কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অটোরিকশা থেকে হৃদয়কে নামিয়ে ফেলে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর প্রথমে কিরিচ দিয়ে হৃদয়ের কানে কোপ দেয়। এতে তার কান কেটে যায়। এরপর আরও কয়েকজন কিশোর তাকে ছুরি দিয়ে পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে।

ঘটনার সময় সড়কে উপস্থিত স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কেউ এগিয়ে আসেননি। তালতলার এক বাসিন্দা বুধবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, সবার হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল। তারা মারমুখী ছিল। এ কারণে কেউ হৃদয়কে বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়নি।

রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা হৃদয়কে পরে তার চাচা সিএনজি অটোরিকশায় করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আরও পড়ুন

বিরোধের জেরেই হত্যা, বলছে পুলিশ

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ মঙ্গলবার রাতেই অভিযান শুরু করে। প্রথমে কামরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ওসি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপের সদস্য হৃদয়ের সঙ্গে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের সদস্যদের সপ্তাহখানেক আগে সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে দুই পক্ষের ‘বড় ভাই’ বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। এরপর হৃদয় বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বাসা থেকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।

ওসি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। নিহতের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আকবর শাহ এলাকায় তার দাফন হওয়ার কথা রয়েছে।

নিহত কিশোর মো. হৃদয়
ছবি: সংগৃহীত

দুই গ্রুপের পেছনে ‘বড় ভাই’

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত হৃদয় খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনি এলাকার বিজয়, কামরান ও শান্তের নেতৃত্বাধীন ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপের সদস্য ছিল। স্থানীয়ভাবে তারা খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

জানতে চাইলে খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিহত হৃদয়কে আমি চিনি না। আমার কোনো কিশোর গ্যাং নেই। ওই এলাকা (ওয়্যারলেস) সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই।’

অন্যদিকে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপটি নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা ও তার ভাই রকিবুল ইসলামের নির্দেশে পরিচালিত হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য। স্থানীয় বাসিন্দারা দুই গ্রুপের বিরুদ্ধে দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন।

গত ৮ জুন সরকারি জায়গা দখলের চেষ্টা ও অস্ত্রবাজির অভিযোগে ওয়াকিলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় অস্ত্রবাজি, জায়গা দখল, কিশোর গ্যাং ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তিনি বর্তমানে পলাতক।

তবে ওয়াকিলের ভাই নগর ছাত্রদলের সদস্য রকি হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না’

বুধবার দুপুরে খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে হৃদয়ের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা বসে কাঁদছেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

হৃদয় তার বাবার সঙ্গে ভ্যানে করে সবজি বিক্রিতে সহযোগিতা করত। হৃদয়ের বাবা কুরবান আলী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ছেলেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু আর কোনো বাবাকে যেন ছেলেকে হারাতে না হয়।’

কুরবান আলী বলেন, তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। এখন তাঁর কী হবে, সেই চিন্তায় আছেন।