কাপাসিয়ায় ৫ খুন
‘বুহির মাইধ্যি সব চাপা দিয়া রাখতিরে মা, আমারে কইশনাই রে’—নিহত শারমিনের বাবার আহাজারি
‘অ মা, বুহির মাইধ্যি সব চাপা দিয়া রাখতিরে মা। আমারে কইশনাই রে’—নিজের মেয়ে, ছেলে ও তিন নাতনিকে হারিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন ৭০ বছর বয়সী মো. শাহাদাত মিয়া। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি গ্রামে।
আজ শনিবার সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একটি বহুতল বাড়ি থেকে তাঁর মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০), ছেলে রসুল মিয়া (২৩), নাতনি মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮) ও ফারিয়ার (২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়াকে দায়ী করছেন স্বজনেরা। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক।
ঘটনার খবর পেয়ে আজ বেলা ১টার দিকে গোপালগঞ্জ থেকে কাপাসিয়ায় ঘটনাস্থলে পৌঁছান নিহত শারমিন আক্তারের বাবা মো. শাহাদাত মিয়া, বোন ফাতেমা বেগমসহ অন্য স্বজনেরা।
ঘরের ভেতরে পড়ে থাকা লাশ দেখে বাইরে এসে চিৎকার শুরু করেন শাহাদাত মিয়াসহ স্বজনেরা। আহাজারি করতে করতে বৃদ্ধ শাহাদাত মিয়া বলেন, ‘অ রে মা। তুই যদি খালি আমারে কইতি যে আব্বা, এই হইতাছে, তোরে কি আমি দিতাম আব্বা? আমার পাঁচটা যদি খাতি পারে, তে তুইও তো খাতি পারতিরি মা। তোর মা আমারে কইসিল, তুমি ওর (ফোরকান) নামে জিডি হরি থোও। ওর ভাব–লক্ষণ ভালো না। আমি কইছি, থাক, জিডি হরলি মাইয়া টিকতি পারবি না।’
নিহত শারমিনের বোন ফাতেমা বেগম আহাজারি করে বলেন, ‘সব শেষ কইরা দিছে। সবাইরে মাইরা ফালাইছে। সব শেষ।’
শারমিনের মায়ের আহাজারি
আমাদের গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সন্তান ও নাতি–নাতনিদের হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নিহত শারমিন আক্তার ও রসুল মোল্লার মা ফিরোজা বেগম। বুক চাপড়ে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘আমার বাবারে মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজার ধনডারে শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচমু...।’
আজ শনিবার সকালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন ফিরোজা বেগম। মূর্ছা অবস্থা থেকে জেগে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আমার বাজান গতকাল নতুন জামা–প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পইরা হাসতে হাসতে বোনের বাসায় গেছে। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া! আমার রসুল আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে...।’ স্বজনেরা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলে আবার চিৎকার করে কাঁদছিলেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শাহাদাত মোল্লা ও ফিরোজা বেগম দম্পতির চার মেয়ে ও তিন ছেলের মধ্যে শারমিন ছিলেন তৃতীয় ও রসুল সবার ছোট। তাঁদের বড় মেয়ে কয়েক বছর আগে মারা যান। এবার একসঙ্গে আরও দুই সন্তানকে হারাল পরিবারটি।
শারমিন ও রসুলের চাচা খবির মোল্লা বলেন, মা–বাবার সামনে সন্তানদের এভাবে মেরে ফেললে তাঁরা কেমনে বাঁচবেন? রসুল গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করত। সে বড় বোনের বাসায় থাকত। তিনি বলেন, গতকাল শুক্রবার শারমিনের বাসায় যাওয়ার পর রাত আটটার দিকে রসুলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, হয়তো ফোনে চার্জ নেই। পরে আজ ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ফোরকান মোল্লার ভাই জব্বার মোল্লা ফোন করে জানান, ওই বাসার সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৭ বছর আগে ফোরকান মোল্লার সঙ্গে শারমিন আক্তারের বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছর পর থেকে ঢাকায় থাকতেন। ছয় মাস আগে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। ফোরকান প্রাইভেট কার চালিয়ে সংসার চালাতেন।
খবির মোল্লা জানান, আইনিপ্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পাইককান্দি গ্রামে দাফন করা হবে।