রাজশাহীতে পুনঃখননে প্রাণ ফিরে পেল মেহেরের পুকুর
পুকুরে পানি যখন টলমল করছিল, তখনই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পুকুরটির শ্রেণি ‘ভিটা’ করা হয়েছিল। ধরা পড়ার পর প্রশাসন খতিয়ান সংশোধন করে ভিটাকে আবার পুকুর বানিয়ে দেয়। কিন্তু সেই চক্র বসে নেই। তারা ধীরে ধীরে বিভিন্ন আবর্জনা ফেলে ও পাড়ে ইট ভাঙতে ভাঙতে পুকুরটির একাংশ ভরাট করে ফেলে। অভিযোগ পেয়ে এবার এক্সকাভেটর দিয়ে প্রশাসন সেই ভরাট করা অংশ গত মঙ্গলবার সারা দিনে তুলে ফেলে। এর আগে একইভাবে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে নগরের মোল্লাপাড়া এলাকায় ভরাট করা একটি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে।
পুকুরটি নগরের আহম্মদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের আরাজি শিরোইল মৌজায় অবস্থিত। এটি কাল ধরে ‘মেহেরের পুকুর’ নামে পরিচিত। ২০২২ সালের মার্চে পুকুরটির অংশবিশেষ নগরের রানিনগর এলাকার শহিদুল ইসলাম ও তালাইমারী এলাকার তৌফিক হাসান পুকুরটির মূল মালিকের কাছ থেকে কিনে নেন। এরপর ২০২৩ সালেল ৫ জুন বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয়ে আস্ত পুকুরের শ্রেণি বদলে ভিটা (আবাসিক) করে ফেলা হয়।
নগরে একটি প্রভাবশালী মহল এভাবে সস্তায় পুকুর কিনে শ্রেণি পরিবর্তন করে ভরাট করে চড়া দামে প্লট আকারে বিক্রি করছেন। যদিও নগরে পুকুর ভরাট নিষিদ্ধের বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। তা ছাড়া নিয়ম অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের আনুমতি ছাড়া কোনো ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তারা এ পরিবর্তন করেছে। এ জন্য জেলা প্রশাসকের অনুমতির প্রয়োজন পড়েনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তনের জালিয়াতি ধরার পড়ার পর গত বছর ১৮ অক্টোবর তৎকালীন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আজিমুদ্দিন এ পুকুরের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নিতে বলেন, কিন্তু তা করা হয়নি। পুকুরের ভরাট করা অংশে ভাঙারির ব্যবসা শুরু হয়। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে ইট–পাথর এনে ভাঙা হয়। আর বর্জ্যগুলো ফেলা হয় পুকুরে। পাশেই রয়েছে আহম্মদপুর প্রাথমিক স্কুল ও টেকনিক্যাল কলেজ। বিকট শব্দের কারণে এলাকাবাসী যেমন অতিষ্ঠ, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটিও লেখাপড়ায় বিঘ্নিত হয়।
গত ১১ নভেম্বর এলাকাবাসী শব্দদূষণ বন্ধ ও পুকুর ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ দেয়। তারাও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কবির আহমেদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্নজন ফোন করলে তিনি শুধু ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে আশ্বাস দিয়ে যান। ২৯ ডিসেম্বর একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ফোন করে বিষয়টি আবার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালককে জানালে তিনি বলেন, ‘ওরা (ভাঙারির ব্যবসায়ীরা) ব্যবসা করছে। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা ছাড়া আমি কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নই।’
এদিকে ভাঙারির ব্যবসায়ীরা দাবি করে আসছিলেন, তাঁদের নাকি সব কেনা আছে। তাঁদের কিছু করা যাবে না। গত দেড় বছরেও এই পুকুরের বেড়া ও ভরাট করা অংশের উচ্ছেদ হয়নি।
ওই জায়গায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে সেখানে অভিযান চালান প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পুকুর ভরাটে জড়িত ব্যক্তিরা তখন সরে পড়েন। বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদের নেতৃত্বে পুকুর উদ্ধার অভিযানে ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন ও বোয়ালিয়া থানার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ অভিযান চলে।
স্থানীয় লোকজন জানান, পুকুর ভরাটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মালিকপক্ষের প্রায় সাত থেকে আটজন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম স্থানীয় আনার, আরিফ, চঞ্চল, সুমন, চন্দন, তারাসহ আরও কয়েকজন।
অভিযানকালে বোয়ালিয়া থানার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেন জানান, সিটি করপোরেশন এলাকায় পুকুর ভরাট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই পুকুরটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। এই খননকাজে যে ব্যয় হবে, তা পুকুর ভরাটকারীদের কাছ থেকেই আদায় করা হবে। ভবিষ্যতে রাজশাহীতে আর কোনো পুকুর ভরাট করতে দেওয়া হবে না। খবর পেলেই কাজ বন্ধ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এখানে আর ভাঙারি ব্যবসা চলবে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পাচ্ছিলাম যে পুকুরটা ভরাট করা হচ্ছে। পাশের একটি বিল্ডিং ভেঙে তারা ইট ও খোয়া ভেঙে পুকুর ভরাটের কাজ চালাচ্ছে। আমাদের বিভাগীয় কমিশনার স্যারের কাছেও এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে এবং স্যারের নির্দেশে আমরা পুকুরটা আবারও খনন করছি, যাতে পুকুরটি আর ভরাট করতে না পারে।’