সকাল নয়টার দিকে ঘণ্টা তিনেকের অপেক্ষা শেষ হয় জাহানারার। ট্রাক থেকে চাল নামানো শেষ হয়। পরনের কাপড়কে ঝোলা বানিয়ে ট্রাক থেকে ঝাড়ু দিয়ে ফেলা চাল সংগ্রহ করতে থাকেন তিনি। এরপর ট্রাক চলে গেলে রাস্তায় পড়ে থাকা চাল ঝাড়ু দিয়ে এক জায়গায় জড়ো করেন। পলিথিনের ব্যাগে তুলে নেন ময়লা মিশে যাওয়া সেই চাল। প্রতিদিন ভোরেই এই রাস্তায় হাজির হন জাহানারা। জীবিকার তাগিদে চাল কুড়ানোর অপেক্ষায় থাকেন। ট্রাক আসার বাঁধাধরা কোনো নিয়ম না থাকায় কোনো কোনো দিন অপেক্ষা দীর্ঘ হয় তাঁর।

জাহানারার সঙ্গে কথায় কথায় জানা গেল, তাঁর বয়স এখন ৫৫। বাড়ি ছিল পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী গ্রামে। তবে কপোতাক্ষের ভাঙনে চাঁদখালী গ্রামে বেড়ে ওঠা হয়নি তাঁর। হামাগুড়ি দেওয়ার বয়সেই মা–বাবার সঙ্গে পাড়ি জমাতে হয় যশোরের ঝিকরগাছায়। তবে সেখানেও বেশি দিন থাকা হয়নি। জাহানারার বয়স যখন ছয়, তখন চলে আসেন খুলনা শহরে। সেই আসাটা নিজের বা পরিবারের ইচ্ছায়ও ঘটেনি। ভাগ্যই যেন তাঁকে টেনে এনেছিল এই শহরে।

default-image

ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়েছিলেন জানিয়ে জাহানারা বলেন, ‘বয়স যখন ছয় বছর, তখন একদিন ট্রেনে উঠে আর নামতে পারিনি। এরপর হারিয়ে যাই। এখানে আসার পর স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, মাছের আড়তে থাকতাম। পথশিশুদের সঙ্গে দিন কাটাতাম। বিয়ে হয় ১২ বছর বয়সে। স্বামী ময়দার মিলের মিস্ত্রি ছিল। বিয়ের পর মা কারও মাধ্যমে জানতে পারে আমি খুলনায় আছি। খবর পেয়ে মা আমাকে দেখতে আসে।’

কীভাবে বিয়ে হয়েছিল নিজ থেকেই তা বলতে থাকেন জাহানারা। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী এরশাদ শিকদারের (সন্ত্রাসী) ময়দার মিলে কাজ করত। শিকদার তখন ঘাটের সরদার। আমরা ৪ নম্বর ঘাট এলাকায় সরকারি চাল, গম আনতে যেতাম। তাঁরা আমাকে চিনত। এরশাদ শিকদার, জামাই ফারুক এনারা মিলে আমার বিয়ে দেন। বিয়ের ১৬ বছর পর কোলে মেয়ে আসে। মেয়ের জন্মের ৩ বছর, তখন স্বামী মারা যায়। এর পর থেকে এই নানা কাজ করে সংসার চলছে।’

মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন জাহানারা। মেয়ের ঘরে চার নাতি-নাতনি। মেয়ের জামাই ঘাটে শ্রমিকের কাজ করেন। সবাইকে নিয়ে ২১ নম্বর ওয়ার্ডের রেললাইনসংলগ্ন গ্রিনল্যান্ড বস্তিতে থাকেন জাহানারা। প্রতিদিন স্টেশন রোডে আসা ট্রাক থেকে রাস্তায় পড়া চাল সংগ্রহ করেন। আর অবসর সময়ে দোকানে দোকানে পানি সরবরাহ করেন।

default-image

জাহানারা বলেন, ‘দিন চলে যাচ্ছে। পানি দিয়ে প্রতিদিন ৭০-৮০ টাকা আয় হয়। আবার চাল কুড়াই। অনেকে ট্রাকের ওপরে পড়ে থাকা চাল দেয় না। তখন শুধু নিচেরটা কুড়াই। কুড়ানো চাল খাই। এতে সংসারের চালের চাহিদা অনেকটা মিটে যায়। আবার কেনাও লাগে। ৬০ টাকা কেজি চাল কিনতে গেলে কষ্ট হয়ে যায়।’

চাল কুড়ান আরও কয়েকজন। চাল কুড়ানোর অলিখিত নিয়মও আছে। সে নিয়ম ব্যাখ্যা করে জানালেন জাহানারা। তিনি বলেন, প্রতিদিন ১২-১৩টা ট্রাক ঢোকে। শুক্রবার আসে তিন-চারটা ট্রাক। ট্রাক আসার পরপরই ট্রাকের নিচে ঝাড়ু রাখতে হয়। আগে যে ঝাড়ু রাখে, সে চাল পায়। ঝাড়ু দেখলে বুঝতে হবে এখানে লোক আছে। ৭-৮ বছর আগেও ২০-২২ জন ট্রাক থেকে পড়া চাল কুড়াত। এখন চাল কুড়ায় মাত্র তিনজন। এখন বস্তা ভালো হয়ে গেছে। চটের বস্তার নিচে পলিথিন দেওয়া থাকছে। ফলে বস্তা ফাটে কম, চালও পড়ে না।

প্রতিদিন কী পরিমাণ চাল সংগ্রহ করতে পারেন, জানতে চাইলে জাহানারা বলেন, সব দিন ভালো হয় না। প্রতিদিন ভাগ্য ভালো থাকে না। কখনো সারা দিনে আধা কেজি চাল হয়, কখনো তিন-চার কেজি পর্যন্তও হয়। চাল কুড়ানো শেষ হলে সেই চালে মিশে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে করতে জাহানারা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, আমাদের ভালো থাকতে অনেক কিছুই করা লাগে। সেই ছোটবেলা থেকেই তো কষ্ট করে যাচ্ছি। যত দিন শরীরে কুলাবে, এভাবেই চলতে হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন