পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, বজলুর সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে গত জুনে পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি মো. শমসের ও শাহাবুদ্দিন এলাকাছাড়া হন। সিটি শাহীনের মৃত্যুর পর সহযোগীদের নিয়ে তাঁরা এলাকায় ফিরেছেন। শমসের একসময় চনপাড়ার চারটি ব্লকের অন্তত ৫০টি মাদক স্পটের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। শাহাবুদ্দিন নিয়ন্ত্রণ করতেন অন্তত ১৫টি স্পট। গত জুনে বজলুর ও সিটি শাহীন বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে সজল নামের এক কিশোর নিহত হয়। এরপরই সহযোগীদের নিয়ে এলাকাছাড়া হন শমসের ও শাহাবুদ্দিন। ফিরেছেন দীর্ঘদিন এলাকার বাইরে থাকা আরেক মাদককারবারী শাহ আলম ওরফে বড় শাহ আলম।

অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি চনপাড়ায় ফিরে এলে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আবির হোসেন, জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার, নারায়ণগঞ্জ

গত জুনে একটি খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হন চনপাড়ার একটি বাহিনীর প্রধান জয়নাল আবেদীন। তিনিও একসময় বজলুরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে বজলুর ও সিটি শাহীনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হয়। জয়নাল গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর সহযোগীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। কয়েক দিনে জয়নাল বাহিনীর অন্তত ১০ জন এলাকায় ফিরেছেন। এ ছাড়া শফিকুল ইসলাম নামের একজন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা চনপাড়ার ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। বজলুর ও সিটি শাহীনের বিরোধী হিসেবে পরিচিত এই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা এলাকায় খুব কম আসতেন। তবে বজলুরের অনুপস্থিতিতে তিনি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। সিটি শাহীনের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে শফিকুলের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শাহীনের স্ত্রী।

সিটি শাহীনের পরিবারকে হুমকি এবং মাদক ব্যবসার অভিযোগ অস্বীকার করে শফিকুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিপক্ষ এ ধরনের প্রচার–প্রচারণা চালাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার দিনভর চনপাড়া এলাকায় ঘুরে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, শিক্ষক, সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা কেউই নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁদের ভাষ্য, মাদক কেনাবেচা, চাঁদাবাজি, ‘অজ্ঞান পার্টি’, ‘মলম পার্টি’সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতরাই চনপাড়া ‘নিয়ন্ত্রণ’ করে। এই ‘নিয়ন্ত্রণ’কে কেন্দ্র করেই অপরাধী চক্রের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে থাকে। যাঁরা আধিপত্য ধরে রাখতে পারেন, তাঁরাই এলাকায় অবস্থান করেন।

* চনপাড়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে বজলুরবিরোধী কয়েকটি অপরাধী চক্র। * এলাকায় িফরেছেন তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি শমসের ও শাহাবুদ্দিন।

নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি চনপাড়ায় ফিরে এলে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বজলুর যেভাবে নিয়ন্ত্রক

স্থানীয় লোকজন জানান, ২০১৯ সাল পর্যন্ত চনপাড়ার মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের নিয়ন্ত্রক ছিলেন দুজন। একজন কায়েতপাড়া ইউপি সদস্য বজলুর রহমান এবং অন্যজন কায়েতপাড়া ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য বিউটি আক্তার ওরফে কুট্টি। আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রথমে বিউটির স্বামী এম এ হাসান এবং ২০১৯ সালের জুনে বিউটি খুন হলে বদলে যায় পরিস্থিতি। চনপাড়ার ‘নিয়ন্ত্রণ’ চলে আসে বজলুর কাছে। বজলুর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলাসহ ২৬টি মামলা রয়েছে।

এলাকা ছেড়েছেন যাঁরা

৭ নভেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ খুনের সঙ্গে চনপাড়াকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে। ফারদিনের লাশ উদ্ধারের তিন দিন পর র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন সিটি শাহীন। এ দুটি ঘটনায় ব্যাপক আলোচনায় আসে চনপাড়া।

স্থানীয় সূত্র বলছে, সিটি শাহীনের মৃত্যুর পর তিনটি অপরাধী বাহিনীর প্রধান ও তাঁদের সহযোগীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। তাঁরা হলেন ফাহাদ আহম্মেদ ওরফে শাওন, স্বপন ব্যাপারী এবং রায়হান। তাঁরা বজলুর ও সিটি শাহীনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।