'ভোট দেব, তবে কাকে দেব ঠিক করিনি'

আনোয়ারা উপজেলার পাড়া–মহল্লায় এখনো সেভাবে ভোটের হাওয়া লাগেনি। প্রচারণার ব্যানার আর মাইকিংও চোখে পড়ছে কম।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার সীমান্তবর্তী গুয়াপঞ্চক গ্রামের চা–দোকানে নির্বাচনী আড্ডা। গতকাল দুপুরেপ্রথম আলো

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী বাজারের টানেল মোড়ে গত বুধবার রাত নয়টার দিকে আড্ডা দিচ্ছিলেন তিন তরুণ। সবার বয়স বিশের কোঠায়। চায়ের কাপ হাতে আলাপে-আড্ডায় ভোটের প্রসঙ্গ উঠতে দেরি হলো না। সামিউল আলম, মো. মুমিন ও আবদুস সালাম নামের তিন তরুণই এবার নতুন ভোটার হয়েছেন, জীবনে প্রথমবার ভোট দেবেন।

ভোটের পরিবেশ নিয়ে কথা উঠতেই আবদুস সালাম বলে ওঠেন, ‘মাইকের শব্দ নেই, স্লোগান নেই; ভোট এসেছে বলে মনে হচ্ছে না। তবু ভোট দেব। কাকে দেব, ঠিক করিনি।’ সামিউল আলম আর মো. মুমিনও তাঁর সঙ্গে সায় দিলেন। তাঁদের মতে, এবারের নির্বাচনে এখনো উত্তাপ নেই। ভোটের যে জমজমাট পরিবেশ থাকার কথা, সেটা দেখেছেন না তাঁরা।

আনোয়ারা এলাকাটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে পড়েছে। এ এলাকার পাড়া–মহল্লা কিংবা চায়ের দোকানে এখনো সেভাবে ভোটের হাওয়া লাগেনি। কয়েকজন প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা জনসংযোগ করলেও প্রচারণার ব্যানার চোখে পড়ছে কম। পাড়া–মহল্লায় মাইকিংও তেমন নেই। চায়ের দোকানগুলোতে প্রার্থীদের পক্ষে আগের ভোটগুলোতে যেমন কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি চোখে পড়ত, এবার এখনো সে চিত্র দেখা যায়নি।

বুধবার বিকেলে উপজেলার বারশত ইউনিয়নের কালীবাড়ি বাজারের আবু তাহের মার্কেটে কথা হচ্ছিল তেলের দোকানি নুরুল হকের সঙ্গে। নির্বাচনের প্রসঙ্গে আসতেই তিনি বলেন, ‘কী ভোট এল। এখন পর্যন্ত আমার দোকানে একজনমাত্র প্রার্থীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজন প্রার্থীর কর্মী এসেছিলেন ভোট চাইতে। জানি না, ভোট দিতে যাব কি না।’

গত বৃহস্পতিবার সকালে কথা হয় উপজেলার বরুমচড়া কমিউনিটি সেন্টার এলাকার রিকশাচালক মো. টিপুর সঙ্গে। ভোটের আলাপ তুলতেই হেসে বলেন, ‘ভোট কাকে দেব? কেউ তো এখনো ভোটই চাইল না।’

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার এ আসনে এবার সাতজন প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন তিনবারের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মু. রেজাউল মুস্তফা, এনডিএমের মো. এমরান চৌধুরী, জাতীয় পার্টির আবদুর রব চৌধুরী এবং গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী।

এলাকা ঘুরে জানা গেছে, সাত প্রার্থীর মধ্যে প্রচার–প্রচারণায় এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম, জামায়াতের মাহমুদুল হাসান ও ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান। এই তিন প্রার্থী নানাভাবে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। তবে ব্যানার ও মাইকিং কম থাকায় এখনো নির্বাচনী আমেজ দেখা যাচ্ছে না।

বুধবার বিকেলে আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের দোভাষী বাজারে নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রচারণা ও জনসংযোগ করেন বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম। তিনি অতীত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে ভোটারদের কাছে ধানের শীষে ভোট চান। সরওয়ার জামাল নিজাম ছাড়াও প্রতিনিয়ত প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তাঁর স্ত্রী নাজনীন নিজাম ও ছেলে সাহওয়াজ জামাল নিজাম।

জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘প্রচারণার অংশ হিসেবে ঘরে ঘরে যাচ্ছি এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী সমাবেশ করছি। আমরা টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে আনোয়ারা উপকূল রক্ষার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছি।’

একই দিন বিকেল পাঁচটায় উপজেলার বারশত ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যানের বাড়িতে একটি নারী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান। তিনি দাঁড়িপাল্লায় ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

বৃহস্পতিবার দুপুরে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ছত্তারহাট বাজারসহ আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ এবং প্রচারপত্র বিতরণ করেন বৃহত্তর সুন্নি জোট মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা এস এম শাহজাহান। প্রচারণার ফাঁকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আনোয়ারা-কর্ণফুলীর বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, দেয়াঙ পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আধুনিক শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য।’

চট্টগ্রাম-১৩ আসনে ১৬টি ইউনিয়ন আছে। এর মধ্যে আনোয়ারা উপজেলায় ১১টি এবং কর্ণফুলী উপজেলায় আছে ৫টি ইউনিয়ন। আনোয়ারায় মোট ভোটার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৪৩০ জন এবং কর্ণফুলীতে ১ লাখ ৭ হাজার ৮৯৪ জন।

এ আসনে ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী। এরপর ১৯৯৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সরওয়ার জামাল নিজাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরে পুনরায় জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ১১ হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতাউর রহমান খান কায়সারকে হারান তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনেও সরওয়ার জামাল নিজাম প্রায় ৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরীকে। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রায় ২৩ হাজার ভোটে সরওয়ার জামাল নিজামকে হারিয়ে জয়লাভ করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী।