বদিউজ্জামান মঙ্গল এখন ‘মধু মঙ্গল’
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নের কুনাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বদিউজ্জামান মঙ্গল। কিশোর বয়স থেকে মধু চাষ করে আসছেন। মৌমাছির সঙ্গে দারুণ মিতালি। মধু ও মৌমাছি বিক্রি করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। পাশাপাশি আরও অনেক মানুষের ভাগ্য বদল করছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কৃষিকাজের পাশাপাশি মধু চাষ শুরু করেছিলেন তিনি। এ সাফল্যে নিজের নাম ছাপিয়ে বদিউজ্জামান মঙ্গল এখন পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘মধু মঙ্গল’ নামে।
বদিউজ্জামানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির মধ্যে টিনশেডের ঘর করে তাতে মৌ–বাক্স রেখে মধু চাষ করছেন। পাশাপাশি ঘরের বারান্দা ও আঙিনায় মৌ–বাক্স রেখেছেন। প্রতি সপ্তাহে একবার বাক্স খুলে পরিচর্যা করা হয়। একেকটি বাক্স থেকে বছরে দু–তিনবার মধু সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে তাঁর বাক্স আছে ৫২টি। একটি বাক্স থেকে তিন থেকে আট কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়। মধুর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ থেকে ১০০ কেজি। প্রতি কেজি মধু বিক্রি করা হয় এক হাজার টাকায়। মধু বিক্রি করে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় হয় বদিউজ্জামানের।
কথায় কথায় উঠে আসে মধু চাষের বিস্তারিত। বছরের চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে মধু সংগ্রহ করা হয় বাক্স থেকে। বাক্সের পাশাপাশি বিভিন্ন পাহাড় থেকে রানি মৌমাছি ও মধু সংগ্রহ করেন বদিউজ্জিমান। নিজে মধু চাষের পাশাপাশি আরও অনেককে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। মধু চাষের জন্য বাক্স তৈরি করেও বিক্রি করেন বদিউজ্জামান। একেকটি বাক্স ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করেন। আর মৌমাছিসহ একটি বাক্স পাঁচ–ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করেন বদিউজ্জামান। তিনি জানান, শুধু কুনাগাঁও গ্রামে ১৫০ থেকে ২০০টি মৌ–বাক্স আছে।
বদিউজ্জামান মঙ্গল বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহের চেষ্টা করতাম। কিশোর বয়সে বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চল থেকে মৌমাছি ও মধু সংগ্রহ করে বিক্রি করতাম। মধু সংগ্রহ করা আমার নেশা হয়ে গেছে। এ জন্য সবাই আমাকে ভালোবেসে মধু মঙ্গল বলে ডাকে। এখনো অনেক মানুষ আমাদের মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহের জন্য ডাকেন। একটু সময় পেলে পাহাড়ে গিয়ে মধু খুঁজি। খাঁটি মধু কেনার জন্য আমার কাছে দূর–দূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন। অনেকে আবার মধু কিনে বিদেশে বিক্রি করেন। কয়েক বছর আগে সরকার থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ এনে মৌচাকের জন্য বাক্স বানিয়েছিলাম। নতুন করে সহযোগিতা পেলে আরও বাক্স তৈরি করা সম্ভব।’
মধু বিক্রি করে কুনাগাঁও গ্রামের অন্তত ১৫০ জন জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁদের একজন সালাউদ্দিন মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমি মঙ্গল ভাইয়ের (বদিউজ্জামান) কাছ থেকে শিখেছি কীভাবে মৌমাছির বাক্স তৈরি করা হয়। আমি বাক্স তৈরি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করি। আমার ২২টি মৌ–বাক্স আছে, এগুলো থেকে মধু সংগ্রহ করে বিক্রি করি।’
কমলগঞ্জ উপজেলা মধু চাষ উন্নয়ন সমিতির উপদেষ্টা লেখক ও গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, বাড়িতে মধু চাষে সফলতায় কমলগঞ্জের মানুষ বদিউজ্জামান মঙ্গলকে মধু মঙ্গল নামে ডাকেন। প্রত্যেক মধুচাষি একেকজন উদ্যোক্তা। তাঁরা মধু চাষ করে কমলগঞ্জের মধুকে দেশে খাঁটি মধুর একটি ব্র্যান্ড বানিয়েছেন। তাদের সরকারিভাবে আরও সহায়তা করা প্রয়োজন।
মধু চাষ নিয়ে কথা হয় কমলগঞ্জ উপজেলা মধু চাষ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি আলতাফ মাহমুদ বাবুল ও সাধারণ সম্পাদক আজাদ মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, আদমপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নে ২৫০ মধুচাষি পরিবার আছে। শুরুতে বিচ্ছিন্নভাবে মধু চাষ হলেও সমিতি করার পর ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা পাওয়ায় সবাই এখন পরিকল্পিতভাবে বাক্সে মধু চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।