বরিশালে বিএনপি–জামায়াতের ১২ প্রার্থীর ছয়জনই কোটিপতি

বরিশালে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের চেয়ে বিএনপির প্রার্থীদের স্থারব-অস্থাবর সম্পদ বেশি। তেমনি বার্ষিক আয়েও তাঁরা জামায়াতের থেকে এগিয়ে। ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে বিএনপির প্রার্থীরা কোটিপতি। এর বিপরীতে জামায়াতের মাত্র একজন প্রার্থী কোটিপতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য ইসিতে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়।

হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বরিশালের ছয়টি আসনের সব কটিতেই বিএনপির প্রার্থী রয়েছেন। জামায়াত একটি আসনে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ভূঁইয়াকে (ফুয়াদ) সমর্থন দিয়ে ছেড়ে দিলেও বাকি পাঁচটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এতে দেখা যায়, অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ মিলিয়ে দুই দলের ১২ প্রার্থীর মধ্যে ৬ জনই কোটিপতি।

বিএনপির প্রার্থী যাঁরা

বরিশালের ছয়টি আসনে বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে দলটির প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে দলের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ। অপর দিকে বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে দলীয় প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে দলীয় প্রার্থী হয়েছেন রাজিব আহসান। তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। বরিশাল-৫ (সদর-সিটি) আসনে দলীয় প্রার্ধী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার। বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান।

জামায়াতের প্রার্থী যাঁরা

বরিশাল–১ আসনে জেলা জামায়াতের মজলিশে শুরার সদস্য মাওলানা কামরুল ইসলাম, বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে জেলা নায়েবে আমির মাস্টার আবদুল মান্নান, বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ভূঁইয়াকে (ফুয়াদ) সমর্থন দিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। বরিশাল-৫ আসনে দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে জেলা জামায়াতে সেক্রেটারি মাওলানা মাহমুদুন্নবী প্রার্থী হয়েছেন।

ছয়টি আসনে বিএনপি-জামায়াতের ১২ প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে একজন প্রার্থী পেশা রাজনীতি ও সমাজসেবা উল্লেখ করেছেন।

পেশাহীন প্রার্থীর আয় নেই

ছয়টি আসনে বিএনপি-জামায়াতের ১২ প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে একজন প্রার্থী পেশা রাজনীতি ও সমাজসেবা উল্লেখ করেছেন। তিনি বরিশাল-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ। একই সঙ্গে তাঁর বার্ষিক কোনো আয়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি। অবশ্য তাঁর স্ত্রীর পেশা ব্যবসা উল্লেখ করেছেন।

বার্ষিক আয়ে যাঁরা এগিয়ে

বিএনপি-জামায়াতের ১২ প্রার্থীর মধ্যে ৬ জন কোটিপতি। তাঁদের মধ্যে বার্ষিক আয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন বরিশাল-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবেদীন। পেশায় আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের বার্ষিক আয় ৭০ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৭ টাকা। এরপরই রয়েছেন বরিশাল-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। পেশায় ব্যবসায়ী এই প্রার্থী বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪০ লাখ ২৫ হাজার ৯৩৯ টাকা।

বরিশাল-৬ আসনে বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন খানের বার্ষিক ২৩ লাখ ২৮ হাজার ২০০ টাকা। ব্যবসা থেকে তিনি এ অর্থ আয় দেখান। এরপরে আছে বরিশাল-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন। ব্যবসা ও অন্যান্য খাত থেকে তিনি বছরে আয় করেন ১০ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬৪ টাকা।

অস্থাবর-স্থাবর সম্পদে এগিয়ে যাঁরা

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদে এগিয়ে আছেন। তাঁর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৩ লাখ ৪০ হাজার ৯৫৪ টাকা। পেশায় ব্যবসায়ী ও কৃষক মজিবর রহমান সরোয়ার স্থাবর সম্পদের মূল্য দেখিয়েছেন ৩ কোটি ৫৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৬২ টাকা। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আয়কর বিভাগে দেওয়া বিবরণীতে নিজের নিট সম্পদ তিনি ১১ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ৬০২ টাকা উল্লেখ করেছেন।

এরপরই সম্পদের দিক থেকে অবস্থান বরিশাল-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীনের। হলফনামায় তিনি নিজের নামে ১ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার ৮৯৫ টাকা অস্থাবর সম্পদ ও ৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা স্থাবর সম্পদের তথ্য দিয়েছেন।

বরিশাল-২ (বানারীপাড়া–উজিরপুর) আসনের বিএনপি প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদের হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর নিজের নামে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৩ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে ৯৫ লাখ ৪৬ হাজার ১৪৫ টাকা অস্থাবর সম্পদ। পেশা হিসেবে রাজনীতি ও সমাজসেবা উল্লেখ করা সরদার সরফুদ্দিনের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৪২ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৪ টাকা।

বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে এরপরই আছেন বরিশাল-১ আসনের প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। পেশায় ব্যবসায়ী জহির উদ্দিন স্বপনের নিজের নামে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৫২ লাখ ৪৩ হাজার ৮৬০ টাকা। তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৬ টাকা অস্থাবর সম্পদ। তাঁর স্থাবর সম্পদের মূল্য ২ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা।

বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া বরিশালের ছয় প্রার্থীর সবাই পেশায় ব্যবসায়ী। তবে পাঁচজন প্রার্থী কোটিপতি হলেও একমাত্র বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ–হিজলা) আসনের প্রার্থী রাজিব আহসানের সম্পদ কোটির নিচে।

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনের বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন খান হলফনামায় তাঁর অস্থাবর সম্পদের মূল্য দেখিয়েছেন ১ কোটি ৭০ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫৫ টাকা ও স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ টাকা।

এ ছাড়া বরিশাল-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা কামরুল ইসলামের অস্থাবর সম্পদ আছে ২৫ লাখ ৭০ হাজার ৯৬৬ টাকার। পেশায় ‘ওয়াজিয়ান’ এই প্রার্থী স্থাবর সম্পদ উল্লেখ করেছেন ১ কোটি ২৭ রাখ ৪২ হাজার ৯৬৬ টাকার।

সম্পদে পিছিয়ে, মামলায় এগিয়ে বিএনপির রাজিব

হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া বরিশালের ছয় প্রার্থীর সবাই পেশায় ব্যবসায়ী। তবে পাঁচজন প্রার্থী কোটিপতি হলেও একমাত্র বরিশাল-৪ (মেহেন্দীগঞ্জ–হিজলা) আসনের প্রার্থী রাজিব আহসানের সম্পদ কোটির নিচে। স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসানের স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ ৮৩ লাখ টাকা।

সম্পদের দিক থেকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও মামলার সংখ্যায় তিনি এগিয়ে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়ের হওয়া মামলার দিক থেকে তিনিই বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষে। হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগপর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ৮২টি মামলা হয়েছে।