মশায় অতিষ্ঠ নগরবাসী, ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়
চট্টগ্রাম মহানগরের রহমাননগর আবাসিক এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুমাইয়া উসরাতের বাসা। স্বামী কর্মরত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। অফিস শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় দুজনেরই। দিনভর ব্যস্ততা শেষে বাসায় ফিরে একটু স্বস্তিতে থাকবেন, তা আর হয় না। তাঁদের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে ছোট্ট মশা। বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রেখে এবং অ্যারোসল ছিটিয়েও মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না তাঁরা।
এমন যন্ত্রণায় বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ সুমাইয়া উসরাত বলেন, এত দিন শীতকাল ছিল। তাই দরজা-জানালা বন্ধ রাখলেও তেমন সমস্যা হতো না। এর মধ্যেও কীভাবে যেন মশা ঢুকে পড়ে বাসায়। আর সামনে গরমকাল আসছে। বাতাসের জন্য হলেও তো জানালা খোলা রাখতে হবে। তখন মশার উৎপাত কীভাবে সহ্য করবেন, তা নিয়ে এখন থেকে দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে।
অতীতে সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড ব্যবহার করত। এর মধ্যে অ্যাডাল্টিসাইড মশা মারতে এবং লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হয় মশার লার্ভা ধ্বংসে। অ্যাডাল্টিসাইড হিসেবে ডেল্টামেথ্রিন নামের কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে ম্যালাথিয়ন ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে।
মশা নিয়ে এমন যন্ত্রণা এখন চট্টগ্রাম নগরের অধিকাংশ বাসিন্দার। আবাসিক এলাকা থেকে অফিসপাড়া, সড়ক; অলিগলির দোকান থেকে শুরু করে বিপণিবিতান—সবখানে মশার উৎপাত বেড়েছে। নগরবাসীর অভিযোগ, এমন সময়ে মশার উপদ্রব বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের তৎপরতা কম।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, মশা মারতে তাঁদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। কিন্তু মশা ওষুধ বা কীটনাশক–প্রতিরোধী হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন তাঁরা। এর মধ্যে ৩০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড ওষুধ কেনা হচ্ছে। মশার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ১৪ মার্চ বিশেষ অভিযান শুরু করেছে সিটি করপোরেশন।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায়—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তারই বেশি। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ ও জাপানি এনসেফালাইটিস হয়। তবে এ দুটি রোগ দেশে ততটা প্রকট নয়। এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু ও অ্যানোফিলিসের কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়। তবে বছরের এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক কম। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৯৩ জন এবং মারা গেছেন ১ জন।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, ওষুধ ছিটানোয় কোনো অবহেলা নেই। নিয়ম করে প্রায় সব এলাকায় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতে সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড ব্যবহার করত। এর মধ্যে অ্যাডাল্টিসাইড মশা মারতে এবং লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হয় মশার লার্ভা ধ্বংসে। অ্যাডাল্টিসাইড হিসেবে ডেল্টামেথ্রিন নামের কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে ম্যালাথিয়ন ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে।
এ ছাড়া গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে মশা নিধনে আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বিটিআই (বাসিলাম থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) ব্যবহার শুরু করে সিটি করপোরেশন। বিটিআই একধরনের ব্যাকটেরিয়া। মশার লার্ভা ধ্বংস করে বিটিআই। গত বছরের ২৬ মার্চ নগরের বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ সড়কের সামনের খালে পরীক্ষামূলকভাবে বিটিআই লার্ভিসাইড প্রয়োগ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন।
ওষুধ ছিটানোর পরও কেন মশার উৎপাত কমছে না, তার কারণ জানতে চাওয়া হয় সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরীর কাছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। পুরোনো ওষুধের পাশাপাশি নতুন ও দামি ওষুধও ব্যবহার করছেন। সাধারণত মশা নিধনে কোনো ওষুধ পাঁচ বছর একটানা ব্যবহার করলে মশা ওই ওষুধ–প্রতিরোধী হয়ে যায়। এখন যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, তা ব্যবহার করা হচ্ছে তিন থেকে চার বছর ধরে। তাই ধারণা করছেন, মশা ওষুধ–প্রতিরোধী হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘হয়তো ওষুধের কার্যকারিতা কমে গেছে। তাই ব্যবহৃত ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেব।’
পুরোনো জরিপে চলছে নিধন কার্যক্রম
মশার উপদ্রব বা উৎপাত বা ঘনত্ব কোন কোন এলাকায় বেশি, তা নিয়ে সিটি করপোরেশনের নতুন কোনো জরিপ নেই; নেই কোনো গবেষণাও। পুরোনো জরিপের ভিত্তিতে চলছে মশা নিধনের কার্যক্রম। সিভিল সার্জন কার্যালয় গত বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি—এমন ২৫টি এলাকা চিহ্নিত করে। চিকুনগুনিয়ার জন্যও হটস্পট হিসেবে ২৫টি এলাকা চিহ্নিত করা হয়।
সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মশার ঘনত্ব বা হটস্পট নির্ধারণে এ বছর কোনো জরিপ করা হয়নি। তবে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) একটি গবেষণা করেছে। ওই গবেষণায় নগরের হটস্পটগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও ওই গবেষণা প্রতিবেদন সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়নি; তারপরও বিভিন্ন মাধ্যমে হটস্পটগুলোর তথ্য নিয়েছেন। সেখানে গুরুত্ব দিয়ে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
২০২১ সালে সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরীর অনুরোধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দল ‘মশকনিধন কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই’ শীর্ষক গবেষণা করে। এরপর নতুন করে কোনো গবেষণা করা হয়নি। ওই গবেষক দলের সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে স্বাভাবিকভাবেই মশার মধ্যে একটি প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। মশার এই প্রতিরোধক্ষমতার পেছনে তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন দায়ী হতে পারে। কোন নির্দিষ্ট জিনের কারণে মশা এ ক্ষমতা অর্জন করছে, তা নিশ্চিত করার জন্য গবেষণার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। মশা নিধনে রাসায়নিক কীটনাশক বা ওষুধের পাশাপাশি হারবাল ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘নালা-নর্দমা ও খাল–জলাশয় নিয়মিত পরিষ্কার রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু আমাদের পরামর্শের বেশির ভাগ মানা হয়নি। এ কারণে মশার উৎপাত তো কমেইনি, উল্টো কোথাও বসলে বা দাঁড়ালে শরীরের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়ে আসে।’