বহিষ্কার হওয়ার এক বছর পর জানা গেল, আম্মার ছাত্রশিবিরের ‘সাথি’ ছিলেন

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথি ছিলেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। নৈতিক পদস্খলন, নারীদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অর্থের বিনিময়ে পদবাণিজ্য, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের তিনটি সাংগঠনিক চিঠি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। চিঠিগুলো শিবিরের অফিশিয়াল প্যাডে না থাকলেও শিবিরের বর্তমান দায়িত্বশীল একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর মধ্যে দুটি চিঠিতে অভিযোগের উল্লেখ করে তাঁর সাথি পদ প্রথমে মুলতবি এবং পরে বাতিলের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আরেকটি চিঠিতে শিবিরের জনশক্তিকে তাঁর সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ না রাখা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাতের সময় সালাম বিনিময় না করতে বলা হয়েছে।

বুধবার চিঠির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে যুক্তি খণ্ডন করে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি অভিযোগগুলো মিথ্যা দাবি করে বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হলেও কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ছাত্রশিবিরের পদে থাকার বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি আম্মার। অবশ্য ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকারও করেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বয়কদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সালাহউদ্দিন আম্মার। পটপরিবর্তনের পর সমন্বয়কদের মধ্যে মেহেদী সজীব, ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজাসহ কয়েকজন ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রকাশ্যে আসেন। এমন অবস্থায় সালাহউদ্দিন আম্মারের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন ওঠে। গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচনেও আম্মারের নেতৃত্বে শিবির ‘ডামি’ প্যানেল ঘোষণা করেছে বলেও আলোচনা ছিল ক্যাম্পাসে। এই প্যানেলের ভিপি পদে লড়েছিলেন সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব ও এজিএস পদে আকিল বিন তালেব।

মেহেদী বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক পদে রয়েছেন। তবে গুঞ্জন রয়েছে, আকিল বিন তালেব প্যানেল থেকে সরে দাঁড়িয়ে শিবিরের সঙ্গে ‘আঁতাত’ করে সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তবে বরাবরের মতো আম্মার ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

আম্মার গণমাধ্যমকর্মীদের বলতেন, তিনি শিবির ঘরোনার। শিবিরের আবহে তিনি বেড়ে উঠেছেন। এ জন্য তাঁকে অনেকে শিবির মনে করেন। অন্যদিকে শিবিরের নেতা-কর্মীরা দাবি করতেন, আম্মারের সঙ্গে শিবিরের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের চিঠির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন আম্মারের সাথি পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় রাবি শাখা ছাত্রশিবির। এর আগে একই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি ও রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদবাণিজ্যের অভিযোগসহ আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলনের বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব অভিযোগ সংগঠনের নজরে আসে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শাখার মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় অভিযোগগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলনের অভিযোগ আমলে নিয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাঁর সাথি পদ মুলতবি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরবর্তী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং তাঁকে বারবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও সংশোধন না হওয়ায় সালাহউদ্দিন আম্মারের সাথি পদ বাতিল করা হয়েছে।

সর্বশেষ চলতি বছরের ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের বর্তমান সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষরিত চিঠিতে আগের সিদ্ধান্তগুলোর উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, মেয়েদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন ও সম্পদ তছরুপ এবং সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পরিপন্থী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় আম্মারের সাথি পদ মুলতবি করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

এ ছাড়া আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার অভিযোগে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কার কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো মন্তব্য কিংবা প্রতিক্রিয়া না দেখাতে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। শুধু রাকসুর নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের তাঁর সঙ্গে দাপ্তরিক সম্পর্ক রাখার এবং অন্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার অনুরোধও করা হয়।

শিবিরের সঙ্গে আম্মারের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেউ বহিষ্কার হলে এসব তথ্য বাইরে প্রকাশ করার নিয়ম নেই। কারণ, মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। তিনি (আম্মার) তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় পড়ার সময় শিবিরের সাথি পদে যুক্ত ছিলেন। কোডিং সিস্টেমে এখানে স্থানান্তর করা হয়। এভাবে তার ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ক্যাম্পাসে সংশ্লিষ্টতা ছিল।’

মেহেদী হাসান আরও বলেন, ‘সেই জায়গা থেকেই জুলাই আন্দোলনে তাঁকে বিভিন্নভাবে প্রটোকল ও আশ্রয় দিয়েছে শিবির। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারি ও ইসলাম পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সঠিক জবাব দিতে না পারায় সেপ্টেম্বরে তাঁকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।’ শিবির থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় আম্মারের সঙ্গে সংগঠনটির সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করতেন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে শিবিরের দায়িত্বশীল এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনটি চিঠিই সঠিক। তিনি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বহিষ্কার হওয়ায় তাঁর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে বুধবার রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সালাহউদ্দিন আম্মার লিখেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা, চাঁদাবাজি ও অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে, তবে এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন

সালাহউদ্দিন আম্মার লেখেন, ক্যাম্পাসজীবনে কোনো নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে ভাই-বোনের সম্পর্কের বাইরে কোনো আচরণ করেননি। চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে লিখেছেন, জুলাই নিয়ে একটি কনসার্ট আয়োজনের জন্য তৎকালীন উপাচার্যের পরামর্শে বিভিন্ন ব্যাংক ও কোম্পানির কাছে অর্থসহায়তার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন।

পরে ওই প্রস্তাবপত্রকে চাঁদা চাওয়ার চিঠি হিসেবে প্রচার করা হয়। আর অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে লিখেছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজশাহীর স্থানীয় শিক্ষার্থীদের আনা একটি কমিটির সঙ্গে তিনি আগে-পরে কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না।

শিবিরের সাথি পদে থাকা নিয়ে পোস্টে কিছু লেখেননি সালাহউদ্দিন আম্মার। তবে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে লিখেছেন, তাঁকে শিবির বলা হলেও তিনি প্রকাশ্যেই এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং ডানপন্থী সংস্কৃতিচর্চার কারণে তাঁকে শিবিরের মানদণ্ডে ফেলা যেতে পারে। তিনি শিবিরের অফিশিয়াল গানে অভিনয় করেছেন। আম্মারের ভাষ্য, ‘আমি আজ পর্যন্ত কোনো দিন আনীত অভিযোগগুলোর কোনোটার সঙ্গেই সম্পৃক্ত নই। এখন যেটা আমি করিনি সেটার অভিযোগ যদি আমার বিরুদ্ধে দেন, তো আমি প্রমাণ কীভাবে দিব?’ একই সঙ্গে তাঁকে ‘শিবির’ বলে গালি না দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন