চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই, স্থবির শিক্ষা কার্যক্রম
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস (সিভাসু) বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম লুৎফুল আহসান। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর নিজেদের ক্যাম্পাস থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
অবশ্য শুধু এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষার্থীদের আপত্তির মুখে বিভিন্ন ধাপে পদত্যাগ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি তিনটিতে পদটি খালি পড়ে আছে।
শিক্ষকেরা বলছেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাদেশ ও আইন মেনে নিয়োগ হয়নি। নিয়োগপ্রাপ্ত সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ। এ কারণে পদত্যাগ করতে হয়েছে।
জানা গেছে, বিগত সরকারের পতনের পর শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মো. আবু তাহেরকে পদত্যাগে সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। পরে ১১ আগস্ট মো. আবু তাহের অব্যাহতি চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করেন। এরপর উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তী সময়ে ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারকে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সিভাসু অচল
এ এস এম লুৎফুল আহসানের পদত্যাগের পর ১৯ সেপ্টেম্বর উপাচার্য নিয়োগের আবেদন জানিয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেন সিভাসুর শিক্ষার্থীরা। এতে কেমন উপাচার্য চান, তা তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত ব্যক্তির উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং গবেষণাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষায় দক্ষতা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকাও অপরিহার্য। এ ছাড়া স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল, শিক্ষার্থীবান্ধব কোনো শিক্ষককে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কেমন শিক্ষককে উপাচার্য পদে চান না, এটিও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সহিংসতা ও ছাত্র হত্যার পক্ষে অবস্থান নেওয়া কাউকে তাঁরা মেনে নেবেন না। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত; বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে তাঁরা মেনে নেবেন না।
জানা গেছে, স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা এসব দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীরা বর্তমানে আন্দোলন করছেন। শ্রেণি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে না। ৩ অক্টোবর ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। ৪ অক্টোবর রাতে মশালমিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। গত শনিবার ক্যাম্পাসের মূল ফটক লাগোয়া জাকির হোসেন সড়ক বন্ধ করে ব্লকেড কর্মসূচি পালিত হয়। গত রোববার শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে কমপ্লিট শাটডাউন বা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। সর্বশেষ আজ বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অধ্যাপকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। এতে অংশ নেন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অংশ।
ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের স্নাতকের শিক্ষার্থী মো. শাহরিয়ার হোসেন তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক যোগ্য শিক্ষক আছেন। তাঁদের মধ্যে থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে। কোনোভাবেই আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কারণ, ১৫ বছর ধরে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকেরা নিয়োগ-বাণিজ্য করে গেছেন।
মো. শাহরিয়ার হোসেন তালুকদার প্রথম আলোকে আরও বলেন, নিরপেক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকেরা প্রশাসনিক দায়িত্বে এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বাড়বে। ক্যাম্পাসের বাইরের কোনো ব্যক্তিকে তাঁরা উপাচার্য হিসেবে মেনে নেবেন না। মূলত এসব দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করছেন।
চুয়েট ও রাঙামাটিতে এখনো উপাচার্য নেই
১৪ আগস্ট শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল আলম পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। এখনো চুয়েটে উপাচার্য পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে ২৫ সেপ্টেম্বর উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু উপাচার্য না থাকায় এসব দাবি পূরণ করা হচ্ছে না। এর মধ্যে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সাময়িকভাবে প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল অনুষদের ডিন সুদীপ কুমার পাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উপাচার্য না থাকায় একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট সভা ও শৃঙ্খলা কমিটির সভা হচ্ছে না। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়া, পদোন্নতি, প্রশাসনিক রদবদল আটকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভিন্ন খাতের কেনাকাটা করা যাচ্ছে না। ফলে দ্রুত উপাচার্য নিয়োগ করা দরকার।
অন্যদিকে ১৭ আগস্ট রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন সেলিনা আখতার। সহ-উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন কাঞ্চন চাকমা। এখনো এই দুই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্রুত উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ মু. সেকান্দার খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পটপরিবর্তনের পর কেউ অনিশ্চয়তা থেকে ও কেউ বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেছেন। এখন প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে গতি ফেরাতে দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা উচিত।