রৌমারীতে জমির তুলনায় সারের বরাদ্দ কম, বিতরণেও সমস্যা, সমন্বয়হীনতা 

কয়েক দিন বিরতি দিয়ে বিক্রয়কেন্দ্র খোলায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কৃষক সার নিতে ভিড় করেন। 

সার নিতে পরিবেশকের দোকানের সামনে স্লিপ হাতে কৃষকদের দীর্ঘ সারি। গতকাল দুপুরে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ি বাজারেছবি: জাহানুর রহমান

এবার বন্যা না হওয়ায় কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় ধান চাষের জমি বেড়েছে ১ হাজার ৬২৫ হেক্টর। জমির পরিমাণ বাড়লেও সে অনুযায়ী সারের বরাদ্দ হয়নি। আবার চাহিদার তুলনায় সরবরাহও কম।

অন্যদিকে কৃষকের সংখ্যা বিবেচনায় না নিয়ে ইউনিয়নভিত্তিক সারের বরাদ্দ ঠিক করা হয়। এর পাশাপাশি সার বিতরণে প্রশাসন, পরিবেশক (ডিলার) ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এসব কারণে উপজেলায় সারের সংকট তৈরি হয়েছে। 

সরকার নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো সার না পাওয়ায় ঘটনায় আগে থেকেই ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। মূলত এ ক্ষোভ থেকেই গত সোমবার সকালে উপজেলার বন্দবেড় বাজারে মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, পরিবেশকদের বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিদিন খোলা থাকে না। কয়েক দিন বিরতি দিয়ে বিক্রয়কেন্দ্র খোলায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কৃষক সার নিতে ভিড় করেন। সোমবারের ঘটনার মূল কারণ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সার না পাওয়া।

উপজেলায় সারসংকট মূলত কৃষকদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক থেকে হয়েছে। বণ্টন ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটির কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
মো. মাহবুবুল হাসান, ইউএনও, রৌমারী

এর আগে গত ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে এক পরিবেশকের গুদামের বেড়া ভেঙে ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান কৃষকেরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে ১১৫ বস্তা সার ফেরত দেন তাঁরা। ওই ঘটনায় পরিবেশক মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে সময়মতো সার না দেওয়া ও ক্যাশ মেমোতে অসংগতির অভিযোগ ওঠে। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

কুড়িগ্রাম শহর থেকে সড়কপথে সরাসরি রৌমারী যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। শহর থেকে প্রথমে সড়কপথে যেতে হয় প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে চিলমারী বন্দরে। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় (ট্রলার) নদীপথে আড়াই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় রৌমারী ফেরিঘাটে। এরপর চার কিলোমিটার সড়কপথ পাড়ি দিয়ে রৌমারী উপজেলা সদরে যেতে হয়।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে কুড়িগ্রাম শহর থেকে রৌমারীর উদ্দেশে যাত্রা করেন এই প্রতিবেদক। সড়ক ও নদীপথ পেরিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় রৌমারী উপজেলায় পৌঁছান তিনি। এরপর বিকেল চারটা পর্যন্ত উপজেলার শৌলমারী, বন্দবেড় ও রৌমারী সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন পরিবেশকের বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখেন। পাশাপাশি সার বিক্রেতা, কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। তাঁদের সবার বক্তব্যে কৃষকের চাহিদামতো সার না পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।

সারের জন্য ঘুরছেন কৃষকেরা

রৌমারীর চর বোয়ালমারী গ্রামের কৃষক আবদুস সালাম তিন বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। ধান রোপণের ৪০ দিন পার হলেও কোনো সার দিতে পারেননি। গতকাল তিনি বলেন, ‘প্রায় এক ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থেকেও সার পাইনি। অসুস্থ হয়ে পড়ায় ছেলেকে স্লিপ দিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছি।’

চর বোয়ালমারী গ্রামের আরেক কৃষক আবদুল জালাল পাঁচ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, চার দিন ধরে সার নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন।

খুচরা দোকানে সার এক ঘণ্টায় শেষ

বন্দবেড় ইউনিয়নে গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর সোমবার মতবিনিময় সভা করে প্রশাসন। সেখানে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল পরীক্ষামূলকভাবে রৌমারী সদরের নয়টি খুচরা দোকানে ৪০ বস্তা সার সরবরাহ করা হয়। উপজেলা সদরের ভোলামোড় এলাকার খুচরা বিক্রেতা আমিরুল ইসলাম বলেন, সকাল সাতটার দিকে ২০০ কেজি সার পাওয়ার পর এক ঘণ্টার মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যায়। কৃষকের ভিড় সামলাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

তিন বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। ধান রোপণের ৪০ দিন পার হলেও কোনো সার দিতে পারেননি। গতকাল তিনি বলেন, ‘প্রায় এক ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থেকেও সার পাইনি। অসুস্থ হয়ে পড়ায় ছেলেকে স্লিপ দিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছি।’
আবদুস সালাম, কৃষক, চর বোয়ালমারী

চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের ফারাক

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রৌমারীতে এবার ইউরিয়ার বরাদ্দ ২ হাজার ৪০ মেট্রিক টন, টিএসপি ৫১০ মেট্রিক টন এবং ডিএপি ৯০০ মেট্রিক টন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার হিসাবে, প্রতি বিঘায় (স্থানীয়ভাবে ৬২ শতকে এক বিঘা ধরা হয়) ৫০ কেজি ইউরিয়া এবং ৪০ কেজি করে টিএসপি ও ডিএপি প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় ২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন। টিএসপি ও ডিএপির চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন করে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া বলেন, আগাম বাদাম, গম ও ভুট্টার জন্য অনেক কৃষক সার সংগ্রহ করে রাখেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় সারসংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ায় কৃষকদের মধ্যে বাড়তি সার কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এবার বন্যা না হওয়ায় অতিরিক্ত ১ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এতে সারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

একসঙ্গে হাজার কৃষক, গুদামে ভাঙচুর

উপজেলার বন্দবেড় বাজারের মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে সোমবার সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সার নিতে জড়ো হন। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, গুদামে তখন ৭৫০ বস্তা সার ছিল। ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে প্রায় অর্ধশত বস্তা সার নিয়ে যান কেউ কেউ। পরে কয়েকজন সার ও টাকা ফেরত দেন। এতে প্রায় ১৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

একই দিন উপজেলার সদর ইউনিয়নের পরিবেশক মো. শাকিল বলেন, শুধু পরিবেশক পয়েন্টে সার সরবরাহ করে সংকট মোকাবিলা কঠিন। প্রশাসনের নজরদারিতে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিক্রির সুযোগ বাড়ানো হলে কৃষকের চাপ কমবে।

ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দ নিয়েও অসন্তোষ

কৃষি বিভাগ বলছে, নীতিমালা অনুযায়ী ইউনিয়নভিত্তিক সমান পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়; কিন্তু সব ইউনিয়নে কৃষকের সংখ্যা সমান নয়। ফলে কৃষক বেশির ইউনিয়নে দ্রুত সার শেষ হয়ে যাচ্ছে।

আগাম বাদাম, গম ও ভুট্টার জন্য অনেক কৃষক সার সংগ্রহ করে রাখেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় সারসংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ায় কৃষকদের মধ্যে বাড়তি সার কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
মাহবুবুল আলম বসুনিয়া, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা

উপজেলা কৃষি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দবেড় ইউনিয়নে কৃষকের সংখ্যা ৮ হাজার ৫২৮ জন এবং শৌলমারীতে ৬ হাজার ৮৫৮ জন। কিন্তু বরাদ্দের ক্ষেত্রে ইউনিয়নভিত্তিক সমতার নীতি থাকায় দুই ইউনিয়নে সমান সার দেওয়া হয়। এতে সব জায়গার কৃষকের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।

কৃষকদের অভিযোগ, একটি ইউনিয়নের সব কৃষককে একই দিনে সার নিতে ডাকায় পরিবেশকদের বিক্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মতে, একটি ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের কৃষকদের পর্যায়ক্রমে সার দেওয়া হলে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা কমবে।

তবে উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে বলে দাবি রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল হাসানের। তিনি বলেন, উপজেলায় সারসংকট মূলত কৃষকদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক থেকে হয়েছে। বণ্টন ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটির কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

ইউএনও আরও বলেন, কৃষকদের হাতে স্লিপ দিয়ে সার বিতরণ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী স্থানীয় বাজারে খুচরা পর্যায়ে সার বিক্রি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।