ঈশ্বরদীর বেনারসিপল্লি
৯০টি প্লটে মাত্র ৭ কারখানা
২০০৪ সালে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ বছর মেয়াদে এ পল্লি গড়ে তোলা হয়। বরাদ্দ নেওয়া জমিতে ২০০৭ সালে কয়েকটি কারখানা গড়ে ওঠে।
জমি ৫ একর, প্লট ৯০টি। এর মধ্যে কারখানা হয়েছে মাত্র সাতটিতে। বাকি প্লটগুলো আগাছায় পূর্ণ। নেই কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা। এখন সেখানে চলে বখাটে ও মাদকসেবীদের আড্ডা। এটি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় বেনারসিপল্লির চিত্র। ২০ বছর আগে তাঁতিদের জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকার এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু ১৮ বছর পরও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি তাঁত বোর্ড।
সম্প্রতি বেনারসিপল্লি ঘুরে দেখা গেছে, ফতেহ মোহাম্মদপুরের তাঁতপল্লির পাশেই সরকারি এই বেনারসিপল্লির এলাকা। প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। দেখেই বোঝা যায়, সেটি অনেক দিন ধরে খোলা হয় না। ছোট ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে আগাছা আর জঙ্গলে ভরা মাঠ। এর মধ্যেই আছে কয়েকটি কারখানা, একটি কার্যালয়। মাঝখানে একটি মসজিদ। শুধু মসজিদের এলাকাটি পরিচ্ছন্ন। বাকি এলাকা ঝোপঝাড়ে পূর্ণ।
চালু কারখানাগুলোর মধ্যে দুটি জামান টেক্সটাইলের। তারা এসেছে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে। তবে পল্লিতে তাদের নিজস্ব কোনো প্লট বরাদ্দ নেই। স্থানীয় এক তাঁতির নামে বরাদ্দ করা দুটি প্লট ভাড়া নিয়ে তারা কারখানা তৈরি করেছে। কারখানার ব্যবস্থাপক শরিফুল আলম জানান, ফতেহ মোহাম্মদপুরে বেনারসি তৈরির দক্ষ কারিগর রয়েছেন। ভালো কারিগর পাবেন, এ আশায় তাঁরা কারখানা করেছেন। তাঁদের দুটি কারখানায় ৩০টি তাঁত চালু আছে। প্রতি সপ্তাহে ২৫ থেকে ২৭টি শাড়ি তৈরি করছেন তাঁরা। তবে তাঁরা সরকারি বেনারসিপল্লির কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। এ এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই।
স্থানীয় বেনারসি তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর উত্তর ভারতের কয়েকটি অঞ্চল থেকে কয়েকজন বেনারসি কারিগর ঈশ্বরদীর ফতেহ মোহাম্মদপুর এলাকায় বসতি গড়েন। তাঁরা সেখানে বেনারসি ও কাতানসহ বেশ কয়েক ধরনের অভিজাত শাড়ি বোনার কাজ শুরু করেন। বর্তমানে পুরোনো সেই কারিগরদের কেউ আর বেঁচে নেই। তবে বংশপরম্পরায় তাঁদের উত্তরসূরিরা পৈতৃক ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। এখনো প্রায় ২০০ কারিগর বেনারসি ও কাতান শাড়ি বুনে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করেন।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তা ও তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেনারসিশিল্পকে রক্ষা করতে ২০০৪ সালে সরকার বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে ফতেহ মোহাম্মদপুরে একটি বেনারসিপল্লি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। সে অনুযায়ী ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ বছর মেয়াদে এ পল্লি গড়ে তোলা হয়। ৫ একর জমিতে ৯০টি প্লট তৈরি করে তাঁতিদের স্বল্প মূল্যে তা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ নেওয়া জমিতে ২০০৭ সালে সাতটি কারখানা তৈরি করা হয়।
তাঁতিরা বলছেন, প্লট বরাদ্দ দেওয়ার সময় কথা ছিল, বেনারসি শাড়ি তৈরির জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরেও এসব সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়নি। সুতা প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি কারখানা করার কথা ছিল, সেটিও হয়নি। ফলে তাঁতিদের ঢাকা থেকে সুতা প্রক্রিয়া করে আনতে হচ্ছে। এতে প্রতিটি শাড়িতে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বেনারসিপল্লিতে কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। একজন ব্যবস্থাপক পুরো পল্লি দেখভাল করেন। ফলে এখানে স্থানীয় তাঁতিদের কেউ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। দিনের পর দিন প্লটগুলো খালি পড়ে থাকছে। যে কয়টি কারখানা চালু হয়েছে, সেগুলোর মালিকেরা বাইরের জেলা থেকে এসেছেন।
তাঁতি জাবেদ বেনারসি জানান, তাঁতিদের সুবিধা দিতে বেনারসিপল্লি করা হলেও কোনো সুবিধা দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁরা সরকারি পল্লিতে যাননি। কষ্ট করে বাড়িতেই কাজ করছেন।
ঈশ্বরদী বেনারসিপল্লিতে কর্মরত বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ওবাইদুর রহমান বলেন, মূলত তাঁতি সমিতির মাধ্যমে পল্লির প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ফলে আসল তাঁতিরা প্লট বরাদ্দ পাননি বলে তাঁদের মনে হয়েছে। তাঁদের নিয়ে অনেকবার বৈঠক করেছেন। কিন্তু তাঁরা কারখানা করতে আগ্রহী হননি। অনেকে প্লটের কিস্তির টাকাও পরিশোধ করেননি। অনেকে আবার নিয়ম ভেঙে প্লট বিক্রি করেছেন। সম্প্রতি তাঁদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘তাঁতিরা তো এখানে কারখানাই করেননি। তাঁরা কারখানা করলে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।’