জুডিশিয়াল সার্ভিসে সুপারিশ পেলেন ‘তুরি’ জনগোষ্ঠীর কাজল
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাই গ্রামে বৃহস্পতিবার বিকেলে যেন উৎসবের আমেজ। রাজশাহী থেকে গ্রামে ফিরেছেন কাজল পাঁড়ে। তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন গ্রামের শিক্ষার্থীরা। সঙ্গে ছিলেন কাজলের মা পঞ্চমী জেড়ি ও বড় বোন কল্পনা পাঁড়ে।
সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ‘তুরি’ জনগোষ্ঠীর ছেলে কাজল (২৯)। ‘পাঁড়ে’ তুরি জনগোষ্ঠীর একটি পদবি। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ (সহকারী জজ) হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন তিনি। বুধবার সন্ধ্যায় এক বন্ধুর ফোনে ফল প্রকাশের খবর পান কাজল। পরে ওয়েবসাইটে ফল দেখে কাজল নিশ্চিত হন, ২০০ জনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ১৪০তম। তাঁর স্বপ্নপূরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামে শুরু হয় আনন্দ।
হামাদের কী যে আনন্দ হোইছে, কহিতে পারবো না। হামাদের বেটা যানি অনেক বড় হয়, গরিবের উপকারে লাগে। বেটার জন্যি বুক গর্বে ফুলে উঠিছে।নরেশ পাঁড়ে, কাজল পাঁড়ের বাবা
ভূমিহীন কৃষক পরিবারের একমাত্র ছেলে কাজল। তাঁর স্বপ্নের কথা গ্রামের মানুষ জানতেন। গ্রামের শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস ছিল, কাজল একদিন বিচারক হবেন।
তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজল পাঁড়েই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী বলে জানান জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতো। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের মধ্যেও কাজলই প্রথম জুডিশিয়ারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
মাধাই গ্রামের জরাধন পাঁড়ে (৭০) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আনন্দেতে কান্দন আসছে রে ভাই। এ রকম জাগাতে হামাদের জাতিগোষ্ঠীর আর কেহু যাইতে পারিনি।’
কাজল পাঁড়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার আট বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার দিনই স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি বিচার বিভাগের ক্যাডার হব। প্রথমেই আমার মনে হয়েছে, এর পেছনে অনেক ত্যাগ, হতাশা জমা হয়ে আছে। অনেক কান্না জমা হয়ে আছে। সেই সব কঠিন দিনের কথাই মনে পড়েছে সবার আগে।’
কাজলের মা পঞ্চমী জেড়ি ও বাবা নরেশ পাঁড়ে ছেলের সাফল্যে আনন্দিত। নরেশ পাঁড়ে বলেন, ‘হামাদের কী যে আনন্দ হোইছে, কহিতে পারবো না। হামাদের বেটা যানি অনেক বড় হয়, গরিবের উপকারে লাগে। বেটার জন্যি বুক গর্বে ফুলে উঠিছে।’
মাধাই গ্রামের মোড়ল নিরঞ্জন তিরকি বলেন, কাজল পাঁড়েকে দেখে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় উৎসাহ পাবে।
দারিদ্র্যের কারণে কাজলের পথ সহজ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, পরিবারকেও সহায়তা করেছেন। সেই সংগ্রাম পেরিয়ে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এখন আনন্দিত তাঁর পরিবারসহ মাধাই গ্রামের মানুষ।