জাহাঙ্গীরনগরে এক শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর, নয় শিক্ষককে ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি সিন্ডিকেটের
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হামলাসহ ক্যাম্পাসে সংঘটিত নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগ থাকা ১৯ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট।
আজ মঙ্গলবার ভোর পাঁচটার দিকে দীর্ঘ সিন্ডিকেট সভা শেষে নতুন প্রশাসনিক ভবনের একটি কক্ষে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে এসব তথ্য জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান।
সিন্ডিকেট সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় হামলায় জড়িত ও মদদদাতা হিসেবে ১৯ শিক্ষক এবং দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল।
সিন্ডিকেটে একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর, নয়জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে পদাবনতি ও বেতন অবনমন, দুজন শিক্ষককে সতর্কীকরণ এবং সাতজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, সিন্ডিকেট সভায় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইস্রাফিল আহমেদের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে সহকারী অধ্যাপক পদ থেকে প্রভাষক পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল হোসেন তালুকদারের দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল করে নিম্নতর বেতনস্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয়েছে। সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক আলমগীর কবিরের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুনকে সতর্কীকরণের পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
উপাচার্য আরও বলেন, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসানের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই বছর পর পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। একই বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দিয়ে দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দীন শিকদারের বেতন প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দিয়ে দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানান, সাবেক সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের বেতন দ্বিতীয় গ্রেডে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হোসনে আরাকে সতর্কীকরণ করা হয়েছে।
সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম খোন্দকার, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ছায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন শিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার খসরু পারভেজকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার মধ্যে সহকারী রেজিস্ট্রার রাজীব চক্রবর্তীকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে এবং দুই বছর পর পুনরায় পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
উপাচার্য জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসায় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল আলম, সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মনজুরুল হক ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদ আখতারের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচারাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাঁদের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা পৃথকভাবে তদন্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
উপাচার্য বলেন, ২০২৪ সালের ১৪, ১৫ ও ১৭ জুলাই সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে গঠিত তদন্ত ও স্ট্রাকচারাল কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রতিটি অভিযুক্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তার ক্ষেত্রে পৃথকভাবে একাধিক শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হয়েছে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পান এবং কোনো অপরাধী দায়মুক্তি না পান।
আপিলে কমল ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সাজাও
ছাত্র আন্দোলনের সময় ১৪ জুলাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের সামনে, ১৫ জুলাই তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে এবং উপাচার্যের বাসভবনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় গত বছরের ৪ আগস্ট ছাত্রলীগের ১৮৯ জন নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে সাজাপ্রাপ্তদের অনেকের আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মোট ৪৩ জন শিক্ষার্থীর শাস্তি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
উপাচার্য জানান, আগে চিরতরে বহিষ্কার হওয়া ২১ জনের মধ্যে পাঁচজনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকিদের মধ্যে আটজনের সাজা কমিয়ে দুই বছর এবং পাঁচজনের সাজা কমিয়ে এক বছর করা হয়েছে। দুই বছরের বহিষ্কারাদেশ পাওয়া আট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয়জনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সনদ বাতিল হওয়া ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকিদের মধ্যে চারজনের সনদ বাতিলের মেয়াদ কমিয়ে এক বছর করা হয়েছে এবং তিনজনের ক্ষেত্রে দুই বছরের মেয়াদ বহাল রাখা হয়েছে। সাময়িক বহিষ্কারে থাকা দুজনের মধ্যে একজনের শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে এবং অপরজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাকি ব্যক্তিদের শাস্তি বহাল আছে।