কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে গিয়ে অবরুদ্ধ হয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ২ মিনিটে তাঁর ফেসবুক ফেসবুক আইডিতে এ বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন।
তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসন বলছে, আমির হামজা অবরুদ্ধ ছিলেন না। সকাল ১০টার দিকে কলেজে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে বক্তব্য দিয়ে দুই ঘণ্টা পর দুপুর ১২টার দিকে তিনি চলে যান।
কলেজ প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা যায়, আজ সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে আন্তবিভাগ মিনিবার ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য জামায়াতের নেতা আমির হামজা। ক্যাম্পাসে বিজ্ঞান বিভাগের সামনে শহীদ মিনার চত্বরে এই খেলার আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে গত রোববার থেকে শহীদ মিনার চত্বরে খেলার জন্য মাঠ উপযোগী করতে কাজ শুরু করে কলেজ প্রশাসন। সোমবার দিবাগত রাতে বিজ্ঞান ভবনের সামনের সড়কের এক পাশের অন্তত ২৪টি গাছ কেটে ফেলা হয়। এ নিয়ে প্রতিবাদ জানান শিক্ষকেরা। শিক্ষার্থীরাও মানবন্ধনসহ দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে অনুষ্ঠানস্থলে ব্যানার হাতে গাছ কাটার প্রতিবাদ জানানো হচ্ছিল। দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাঁরা শাস্তির দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। খেলা উদ্বোধনের সময়ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মাঠের ভেতর স্লোগান দেন। প্রধান অতিথি ও অধ্যক্ষের বক্তব্যের সময় শিক্ষার্থীরা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন। স্লোগানে বলতে থাকেন, ‘গাছ কেন কাটা হলো, আমির হামজা জবাব দে।’ তাঁদের দাবি, গাছ কেটে খেলা হতে পারে না। গাছকাটার বিচার হতে হবে।
সংসদ সদস্য আমির হামজা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও আন্দোলনকারী ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন। তিনি প্রায় সাত মিনিট বক্তব্য দেন। বক্তব্যের মাঝখানে আমির হামজা বলেন, ‘গাছ কে বা কারা কেটেছে তা তদন্তের মাধ্যমে বের করি। কিন্তু বাকি যেগুলো হচ্ছে, এরও তদন্ত করা দরকার। যাঁরা যা করছেন, মনে করছেন আমি হুজুর শুধু, আমি হুজুর না। আমি এগুলোর তালিকা নিয়ে যাব আজকে। আপনাদের যা করা লাগে, আমি তা–ই করব। আমি ভুয়া কি না, তা দেখাব আজকে। কয়জনের তালিকা আমার কাছে আছে অলরেডি। সবচেয়ে ওপরে জানাব। এই কয়জনের সম্পর্কে জানাব। এরা এই শিক্ষা ভবনটা নষ্ট করার জন্য এবং পেছনে কারা আছে, তাদের নামও জানি। তাদের নামেও নালিশ দেব ওপরে। দেখি আপনারা কত দূর পারেন।’
ওই বক্তব্যের পর সেখানে আরও উত্তেজনা বেড়ে যায়। খেলার উদ্বোধনের পর অধ্যক্ষ প্রধান অতিথি আমির হামজাকে নিয়ে তাঁর কার্যালেয় নিয়ে যান। পেছনে আন্দোলনকারীও স্লোগান দিতে দিতে যান সেখানে।
দুপুর ১২টা ২ মিনিটে আমির হামজার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক স্ট্যাটাসে জানান, ‘কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ পরিদর্শনকালীন সময়ে মাননীয় সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা। অ্যাডমিন।’
সরেজমিন দেখা যায়, ফুটবল খেলা চলার সময় পাশেই প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে জটলা। ভেতরে ঢোকার কলাপসিবল গেট দুটি বন্ধ ছিল। সামনে ছাত্রদলের কয়েকজন ও শিক্ষার্থীদের একটি দল অবস্থান করছিল। তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বরকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে ওসিকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঢুকে দেখা যায় আমির হামজাসহ কয়েকজন জামায়াত নেতা ভেতরে বসে আছেন। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাও সেখানে ছিলেন।
দুপুর ১২টা ১৬ মিনিটে আমির হামজার সঙ্গে থাকা তাঁর শ্যালক আবু বকর সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন,‘অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে এমপি মহোদয় অধ্যক্ষের কক্ষে নাশতা করতে যান। সেখানে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন। অফিসে তালা আটকে দেন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে আমাদের নেতা–কর্মীরা এমপিকে বের নিয়ে আসেন।’
আবু বকর সিদ্দিক আরও বলেন, ‘ছাত্রদল এটা করবে স্বাভাবিক। তারা চাচ্ছে কুষ্টিয়াতে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার। কুষ্টিয়াকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। এটা কোনো দলীয় অনুষ্ঠান নয়। এমপি সেখানে গিয়েছেন। ৫৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি এমপি হয়েছেন। তাঁকে ভুয়া ভুয়া বলার এখতিয়ার পেল কোথায়। দ্রুত এর বিরুদ্ধে স্টেপ নেব।’
অভিযোগ অস্বীকার করে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ। গাছ কেটে খেলার মাঠ করায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। উল্টো উনি (আমির হামজা) তাঁদের নামের লিস্ট করার কথা বলেন। এতে তাঁরা বিক্ষোভ করেন।’
কক্ষের বাইরে কিছু ছেলেপুলে চেঁচামেচি করছিল। পুলিশ ছিল। আমি ঠিক অবরুদ্ধ এই কথাটা বলব না। আমরা যখন নাশতা করি, তখন সবাইকে ঢুকতে দিইনি। সেই হিসাবে দরজা বন্ধ ছিল। এটা তো আমরা বন্ধ করে রাখছি। তিনি নির্বিঘ্নে চলে গেছেন।মোল্লা মো. রুহুল আমীন, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোল্লা মো. রুহুল আমীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘খেলা উদ্বোধনের পর আমার রুমে বসে নাশতা করেন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে তিনি (আমির হামজা) পরবর্তী প্রোগ্রামে চলে গেছেন। উনি দুপুর ১২টা পর্যন্ত এখানে ছিলেন। অবরুদ্ধের কোনো বিষয় নয়। কক্ষের বাইরে কিছু ছেলেপুলে চেঁচামেচি করছিল। পুলিশ ছিল। আমি ঠিক অবরুদ্ধ এই কথাটা বলব না। আমরা যখন নাশতা করি, তখন সবাইকে ঢুকতে দিইনি। সেই হিসাবে দরজা বন্ধ ছিল। এটা তো আমরা বন্ধ করে রাখছি। তিনি নির্বিঘ্নে চলে গেছেন।’
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, ‘গাছকাটার বিষয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। সেটার তদন্ত চলছে বলে অধ্যক্ষ জানায়। তিনজন ছাত্র প্রতিনিধি নিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে যান। এমপি মহোদয় অধ্যক্ষের সঙ্গে আলাপ করতে থাকেন। অবরুদ্ধের কোনো বিষয় ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই সবাই বের হয়ে আসি।’